সাভার-আশুলিয়ার ২০ ও গাজীপুরের ৭ কারখানায় ছুটি

সকালে কাজে ফেরা, বিকেলে ফের বিক্ষোভ

এফএনএস | প্রকাশ: ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম
সকালে কাজে ফেরা, বিকেলে ফের বিক্ষোভ
ছবি: FNS

কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষের পর রোববার (৮ নভেম্বর) সকালে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন। উৎপাদনও শুরু হয়। তবে সাভার ও আশুলিয়ার ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, বিকেলে গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আবারও বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। এ সময় কয়েকটি কারখানায় ইট-পাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। গাজীপুরে সাতটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

শ্রমিকদের দাবি ছিল, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। এ দাবিতে কয়েক দিন ধরে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গত ৫ নভেম্বর থেকে অক্টোবর মাসের বেতন দেওয়া শুরু হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু আশা প্রকাশ করেছিলেন, রোববারের মধ্যে অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকেরা বেতন পেয়ে যাবেন।

টানা কয়েক দিনের অসন্তোষের পর রোববার সকালে নির্ধারিত সময়ে সাভার ও আশুলিয়ার অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা হাজির হন। কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রমও শুরু হয়। তবে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখায় প্রথমে সেসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরে আরও কয়েকটি কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে সাভার ও আশুলিয়ার ২০টি কারখানা বন্ধ রাখা হয়।

সকালে স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু হলেও বেলা ৩টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় নতুন করে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কাশিমপুর থেকে অর্ধশতাধিক শ্রমিক লাঠিসোঁটা নিয়ে জরুন এলাকায় আসেন। এ সময় তাঁরা আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকেন। ওই কারখানাগুলোতে তখন উৎপাদন চলছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কারখানার ভেতরে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করেন। খবর পেয়ে বিজিবির সদস্যরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় লাঠিপেটার ঘটনাও ঘটে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকালে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। বেলা ৩টার দিকে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মণ্ডল গ্রুপের বেশ কয়েকজন শ্রমিক জরুন মোড়ে জড়ো হন। তাঁরা আশপাশের ছয় থেকে সাতটি কারখানায় ইট-পাটকেল ছোড়েন। পরে পুলিশ ও বিজিবি তাঁদের সরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় সাতটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

চন্দ্রা-পল্লী বিদ্যুৎ ও কাশিমপুর এলাকার কয়েকটি কারখানাতেও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ কয়েকটি কারখানা দিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও জরুনসহ বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

মজুরি বোর্ড গঠন, ডিসেম্বর থেকে নতুন কাঠামো
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবির মধ্যে রোববার ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। এর আগে শুক্রবার শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে এবং শনিবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফেরার আহ্বানও জানান তিনি।

ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন মজুরি কাঠামো চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর বলে ধরা হবে। শ্রমিকেরা বর্ধিত ও সমন্বিত বেতন পাবেন আগামী জানুয়ারি মাসে। নতুন মজুরি বোর্ড পোশাকশিল্পের সব পদের জন্য ন্যূনতম মজুরি সুপারিশ করবে। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করবে।

বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবলু আক্তার। এ ছাড়া বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন।

এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সাধারণত পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠনের নিয়ম থাকলেও গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন সংশোধনী বিলে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।

তিন জেলায় বিজিবির ৩৩ প্লাটুন মোতায়েন
শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করতে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বিজিবির ৩৩ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরে দায়িত্ব পালন করছেন ১২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য। এই ১২ প্লাটুন তিন জেলায় মোতায়েন করা মোট ৩৩ প্লাটুনের অন্তর্ভুক্ত।

ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুর এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট, জালকুড়ি, বিসিক শিল্পনগরী, চাষাঢ়া, কাঁচপুর ও শিমরাইল এলাকায় তাঁদের মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, আমবাগ, কাশিমপুর, নাওজোড়, ভোগড়া বাইপাস, গাছা ও সালনায়ও বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজিবি সদর দপ্তরের একটি মনিটরিং সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও সরাসরি ভিডিও পর্যবেক্ষণ করছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি জননিরাপত্তা এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির সুরক্ষায় কাজ চলছে।

গাজীপুর জেলাপ্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে জেলায় ১২ প্লাটুন বিজিবি, পাঁচ প্লাটুন আনসার ও আট প্লাটুন এসআরবি মোতায়েন করা হয়েছে। মোট ২৫ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে কাজ করছেন। পাশাপাশি ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানুষের জানমালের ক্ষতি ঠেকাতে তাঁরা কাজ করছেন বলে জানান জেলাপ্রশাসক।

সকালে কাজে ফিরেছিলেন গাজীপুরের শ্রমিকেরাও
গাজীপুরের কোনাবাড়ী, শফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, বাসন সড়ক, টঙ্গী, সালনা, বাংলাবাজার ও শ্রীপুরের বিভিন্ন কারখানায় রোববার সকালে নির্ধারিত সময়ে শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন। সকালে কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদন চলছিল। তবে বিকেলে জরুন এলাকায় নতুন করে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।

গাজীপুরের প্যারাগন সোয়েটারের শ্রমিক রিনা আক্তার বলেন, ‘কয়েক দিনের অস্থিরতার পর আমড়া আবারও কাজে যোগ দিয়েছি। আমড়া কোনো বিশৃঙ্খলা চাঁই না, শান্তি চাঁই। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে চাঁই।’

মস্কো গ্রুপের মেশিন অপারেটর সুমন মিয়া বলেন, ‘আমড়া চাঁই কারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে চলুক। আন্দোলন-সংঘর্ষ হলে শ্রমিকদেরই বেশি ক্ষতি হয়। মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে আমড়া উপকৃত হব।’

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন সকালে জানিয়েছিলেন, শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শ্রমিকেরা কাজে ফিরেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও এলাকায় শিল্প পুলিশের সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলাপ্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহেল রানা জানান, জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে র‍্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। শিল্প পুলিশ, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশ মহাসড়ক এবং বিভিন্ন সড়কে নিরাপত্তা দিচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা ও উৎপাদন অব্যাহত রাখাই তাঁদের লক্ষ্য।

শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. ইসরাইল হাওলাদার জানান, রোববার সকালে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন। আশুলিয়ার কয়েকটি কারখানায় সমস্যা দেখা দিলে ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। সকালে কোথাও বিক্ষোভ, সংঘর্ষ বা সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানান।

এর আগে অক্টোবরের শেষ দিকে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ৩১ অক্টোবর শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। এ সময় মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতির কারণে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ রাখা হয় এবং শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে