লৌহজংয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-প্রতারণার অভিযোগ

এফএনএস (আবু নাসের খান লিমন; লৌহজং, মুন্সীগঞ্জ) : | প্রকাশ: ২ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
লৌহজংয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-প্রতারণার অভিযোগ

মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় অনুমোদনহীন ও অনিয়মে পরিচালিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণ। বিশেষ করে ঘৌড়দৌড় বাজারের লৌহজং-কলেজ রোডে অবস্থিত ‘ডাঃ আঃ মান্নান ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর বিরুদ্ধে লাইসেন্স নবায়ন না থাকা, অদক্ষ জনবল দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুল রিপোর্ট প্রদান, চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে রোগী আকৃষ্ট করা এবং নারী কর্মী ও রোগীদের হয়রানিসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে গত ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এলাকায় বেশ কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগে বলা হয়, ‘ডাঃ আঃ মান্নান ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর মালিক আবু হানিফ বিদ্যুৎ ওরফে হানিফের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নামের সঙ্গে ব্যবহৃত চিকিৎসক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। তঁাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের নামে যঁার নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসক ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঘুষ ও নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার বিষয়ে মালিকের বক্তব্যের কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য আবেদনে সংযুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির কর্মী বলাই চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। আবেদনে দাবি করা হয়, তিনি একই সঙ্গে রিসেপশনে দায়িত্ব পালন, রক্ত সংগ্রহ, রক্ত পরীক্ষা, রিপোর্ট তৈরি, এক্স-রে করা ও এক্স-রে রিপোর্ট প্রদানের মতো একাধিক কাজ করেন। এসব কাজের জন্য তঁার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত সনদ রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এ ছাড়া রক্ত সংগ্রহ ও এক্স-রে করার সময় নারী রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং যৌন হয়রানির অভিযোগও করা হয়েছে। নারী কর্মীদের হয়রানি, বেতন আটকে রাখা এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক নারী কর্মী চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।

চিকিৎসক নিয়োগ ও রোগী দেখানোর ক্ষেত্রেও প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন তঁারা। আবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন নামী-দামি মেডিকেল কলেজের অধ্যাপকদের নাম ব্যবহার করে রোগীদের আকৃষ্ট করা হয়। অথচ বিজ্ঞাপিত চিকিৎসকদের অনেকে নিয়মিত সেখানে উপস্থিত থাকেন না। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে সাধারণ রোগী সেজে গোপনে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, লাইসেন্স ও যন্ত্রপাতি যাচাই, কর্মরত ব্যক্তিদের যোগ্যতা পরীক্ষা এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

আবেদনকারীরা আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতারণা, অব্যবস্থাপনা কিংবা অদক্ষ জনবলের কার্যক্রম মেনে নেওয়া যায় না। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সরেজমিনে গত রবিবার (১ নভেম্বর) বিকালে ডা. আব্দুল মান্নান ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে  মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব)  ঝিনুক বর্মনকে পাওয়া যায়। ঝিনুক বর্মন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ল্যাবে কর্মরত থাকেন। এক্সরে টেকনিশিয়ান মো. রাসেল খান ও প্যাথলজিষ্ট ডা. কল্যান কীর্তনীয়াকে উপস্থিত পাওয়া যায় নাই। কর্তৃপক্ষ জানান তারা দুইজন সপ্তাহে দুই দিন এখানে কর্মরত থাকেন। জরুরী কোন টেস্ট রিপোর্টের প্রয়োজন হলে তাদের সাথে অনলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে রিপোর্ট তৈরী করা হয় বলে জানান ল্যাব টেকনোলজিস্ট ঝিনুক বর্মন।

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে  ডা. আব্দুল মান্নান ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর ব্যাবস্হাপনা পরিচালক মো. আবু হানিফ বিদ্যুৎ জানান, আমার প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঈর্ষাম্বিত হয়ে একটি কুচক্রী মহল আমার ব্যাবসায়িক সুনাম নষ্ট করার জন্য এরকম অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার মরহুম বাব একজন গ্রাম্য ডাক্তার ছিলেন, আমার বাবার নামে প্রতিষ্ঠানের (ডাঃ আব্দুল মান্নান ডায়াগনস্টিক সেন্টার) এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ রূপে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আমি এই মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং যুক্তিসঙ্গত ভাবে এই অভিযোগ খন্ডন করার চেষ্টা করছি। আমার প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে স্থায়ীভাবে একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) কর্মরত আছেন যাহার নাম ঝিনুক বর্মন। ঝিনুক বর্মন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ল্যাবে কর্মরত থাকেন। আমার প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে একজন প্যাথলজিস্ট নিয়োগ করা আছে যাহার নাম প্রফেসর ডা: কল্যাণ কীর্তনীয়া। আমার প্রতিষ্ঠানের ল্যাবের তদারকি করেন।  আমার প্রতিষ্ঠানে একজন এক্স-রে টেকনেশিয়ান (জঈঙ) নিয়োগ করা আছে যাহার নাম মোঃ রাসেল খান।  আমার প্রতিষ্ঠানে যে সমস্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগন চেম্বার করেন তারা ইগউঈ অনুমতি বিহীন কোনো ডিগ্রি ব্যবহার করেন না। আমাদের প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ২ বছরের আপডেট করা বাকি (জবহব)ি কিন্তু লাইসেন্স আপডেট করার জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে যা কিনা তদন্ত কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমার প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সুনামের সহীত ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে আসছে। আমার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনীত বিভিন্ন অভিযোগ এবং যৌন-হয়রানি মূলক অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন যার কোনো প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই।

লৌহজং উপজেলা স্বাস্হ্য কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. জিএম আকবর জানান, এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হুমায়ুন রাজিব স্যার আমাদের নিয়ে গত মাসে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানে তদন্তের জন্য গিয়েছিলেন। আমরা সেখানে গিয়ে কিছু অসংগতি পেয়েছি। তার জন্য আমরা মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসে একটি তদন্ত রিপোর্টে পাঠিয়ছি। সেখান থেকে যে নির্দেশ দেওয়া হবে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যাবস্হা নেওয়া হবে।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা ববি মিতু জানান, এই বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে কথা বলে কি ধরনের সমস্যা আছে তা অবগত হয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যাবস্হা গ্রহন করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে