তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এখন দেশের লাখো পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য জ্বালানি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সেখানে রান্নার প্রধান ভরসা এলপিজি। তাই এই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। চলতি আগস্ট মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা নতুন করে ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়াবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্য বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বিবেচনায় নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামার প্রভাব দেশীয় বাজারে পড়া স্বাভাবিক। তবে একই সঙ্গে এ বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে যে, আন্তর্জাতিক মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। এলপিজির দাম বাড়লেও অটোগ্যাসের মূল্য সামান্য কমানো হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজির এলপিজির দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ ভোক্তা বেসরকারি কোম্পানির এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এড়ানোর সুযোগ সীমিত। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। তাই নতুন মূল্য কার্যকরের পর বাজারে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভোক্তাদের অতিরিক্ত মূল্য গুনতে না হয়। একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা প্রতিরোধ করাও জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলপিজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ও টেকসই জ্বালানি ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর নীতি, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তাস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাহলেই জ্বালানি খাতে ভারসাম্য রক্ষা এবং ভোক্তার আস্থা বজায় রাখা সম্ভব হবে।