শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার মহান ব্রত। দীর্ঘ ৩১ বছরের শিক্ষকতা জীবনে স্নেহ, শাসন, ভালোবাসা ও পাঠদানের মধ্য দিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন তিনি। কর্মজীবনের শেষ দিনে সেই প্রিয় শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর সহকর্মীদের অশ্রুসিক্ত বিদায় তাঁকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার ১৬ নম্বর বারাকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অধীর কুমার কুন্ডু।
শনিবার (৭ নভেম্বর) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁর অবসরজনিত বিদায় উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য ও জমকালো বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সকাল থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজনে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সহকর্মী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মো. জিয়াদ হোসেন। সঞ্চালনা করেন মোহাম্মদ বদিয়ার রহমান। বিদায় সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বারাকপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হীরা ইয়াসমিন।
অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি সৈয়দ আনিসুজ্জামান, প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার মোড়ল এবং বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি মো. মনির হোসেন।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন মোল্লা আবুল বাশার, রিতা জেসমিন, মো. ইমরান হোসেন, মাকসুদুল আনাম, মো. জহুর বিশ্বাস, শেখ আব্দুর রউফ, মো. আনোয়ার হোসেন, দিঘলিয়া উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতা ফরাজী জাকির হোসেন, মো. জুয়েল হাওলাদার, শুয়াইব হোসেন রানা, মো. কামরুল ইসলাম, ইসমাইল হোসেন, সেকেন্দার আলী, শেখ আল মামুনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে অধীর কুমার কুন্ডুর দীর্ঘ ৩১ বছরের শিক্ষকতা জীবনের নানা স্মৃতিচারণ করেন। তাঁরা বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না, বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিদায়ি বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি সহকারী শিক্ষক অধীর কুমার কুন্ডু। দীর্ঘ ৩১ বছরের কর্মজীবনের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয়, সহকর্মী ও প্রিয় শিক্ষার্থীদের ছেড়ে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর আবেগাপ্লুত বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
অনুষ্ঠানে বিদায়ি শিক্ষককে ক্রেস্ট ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী প্রদান করে সম্মাননা জানানো হয়। পাশাপাশি আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ব্যান্ড দলের পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
তবে পুরো আয়োজনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন আকর্ষণ ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানানো। ঘোড়ার গাড়িতে তাঁর বিদায়ের দৃশ্য দেখতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভিড় করেন সহকর্মী, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এ যেন একজন শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
বিদায়ের শেষ মুহূর্তে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। দীর্ঘদিনের সান্নিধ্য, স্নেহ, শাসন ও ভালোবাসার স্মৃতি মনে করে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়স্পর্শী ও অশ্রুসিক্ত পরিবেশের।
সহকারী শিক্ষক অধীর কুমার কুন্ডু ১৯৯৫ সালে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ৩১ বছরের কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা, আদর্শ ও ভালোবাসা শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে আজীবন। ঘোড়ার গাড়িতে তাঁর এই বিদায় যেন কেবল একজন শিক্ষকের কর্মজীবনের সমাপ্তি নয়, বরং ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মিক বন্ধনে গড়ে ওঠা দীর্ঘ এক সম্পর্কের আবেগঘন অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।