বিপুল ভোটেও সংসদের বাইরে আসলাম, প্রতিনিধিত্বের অপেক্ষায় সীতাকুণ্ড

এফএনএস (জহিরুল ইসলাম; সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম) : | প্রকাশ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
বিপুল ভোটেও সংসদের বাইরে আসলাম, প্রতিনিধিত্বের অপেক্ষায় সীতাকুণ্ড

বিপুল ভোটে এগিয়ে থেকেও সংসদে যেতে পারেননি চট্টগ্রাম-৪ আসনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী। প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৫৩ হাজার ৪০৬ ভোট বেশি পেয়েও আইনি জটিলতায় আটকে গেছে তাঁর নির্বাচনি ফল। আপিল বিভাগ তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করায় এখনও চূড়ান্ত হয়নি আসনটির সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব। ফলে ভোটের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে রাখলেও সংসদে এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়নের দাবি তুলে ধরার জন্য একজন প্রতিনিধির অপেক্ষায় রয়েছেন সীতাকুণ্ডসহ চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভোটাররা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গৎ ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম-৪ আসনের ১২৪টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়। এ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮০ জন। নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আসলাম চৌধুরী পান ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার ছিদ্দিক পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৫৩ হাজার ৪০৬। ভোটের হিসাবে চট্টগ্রাম  বিভাগের মধ্যে অন্য প্রার্থীদের চেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অধ্যাপক লায়ন আসলাম চৌধুরী এফসিএ এগিয়ে থাকলেও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ফলের চূড়ান্ত পরিণতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

নির্বাচনের আগেই ঋণখেলাপির অভিযোগে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনি বিরোধ তৈরি হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল প্রকাশ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। ফলে নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পরও তাঁর ফল আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। পরে ৩০ জুন আপিল বিভাগ ঋণখেলাপির কারণে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেন।

এরপর আসনটির পরবর্তী করণীয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে, নাকি নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা থাকলেও আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো বিষয়ই চূড়ান্ত নয়। রায়ের পর নির্বাচন কমিশনার  আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম-৪ আসনটি শুধু সীতাকুণ্ড উপজেলা নয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অংশবিশেষ নিয়েও গঠিত। একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়নের পাশাপাশি নগরের দুটি ওয়ার্ডের ভোটাররাও এ আসনের অন্তর্ভুক্ত। শিল্পকারখানা, জাহাজভাঙা শিল্প, বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, উপকূলীয় জনপদ ও গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক, সব মিলিয়ে এ আসনের সমস্যা ও সম্ভাবনার পরিধি বিস্তৃত। অথচ সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনিশ্চয়তায় এসব এলাকার নানা দাবি জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার বিষয়টি নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

সীতাকুণ্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিরাপত্তা। বিশেষ করে কুমিরায় আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রধান ফটকের কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতের মৃত্যুর পর নিরাপদ পারাপার ও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি নতুন করে সামনে এসেছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ ও নীতিনির্ধারণী মনোযোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সংসদ সদস্যের দায়িত্ব শুধু নির্বাচনি এলাকার প্রতিনিধিত্ব করা নয়, এলাকার সমস্যা জাতীয় সংসদে তুলে ধরা, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা, বাজেট বরাদ্দের দাবি জানানো এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। তাই সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের অনিশ্চয়তা স্থানীয় মানুষের কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক সংকট নয়, উন্নয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি তুলে ধরার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, আদালতের রায় ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত যেন দ্রুত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কার্যকর হয়। তাঁরা চান, আইনের শাসন ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে ভোটারদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হোক। কোনো রাজনৈতিক পক্ষের বিশেষ সুবিধা নয়, বরং আইনসম্মত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কয়েক লাখ ভোটারের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটুক।

বিপুল ভোটের ব্যবধানেও সংসদের বাইরে আসলাম চৌধুরী। অন্যদিকে সীতাকুণ্ডসহ চট্টগ্রাম-৪ আসনের মানুষের অপেক্ষা, কবে কাটবে প্রতিনিধিত্বের অনিশ্চয়তা, কবে তাঁদের এলাকার দাবি-দাওয়া সংসদে তুলে ধরার জন্য নিশ্চিত হবে কার্যকর সংসদীয় কণ্ঠস্বর।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে