ডিসির মানবিক হস্তক্ষেপে অবরোধমুক্ত সীতাকুণ্ড, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষা

এফএনএস (জহিরুল ইসলাম; সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম) : | প্রকাশ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
ডিসির মানবিক হস্তক্ষেপে অবরোধমুক্ত সীতাকুণ্ড, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষা

একটি তরুণ প্রাণের বিনিময়ে সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের সড়ক নিরাপত্তাহীনতার চিত্র। সহপাঠী মাইশা মুশফিরাতের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা, ফুটওভার ব্রিজের অভাব এবং মহাসড়কের পাশে ভারী যানবাহনের অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগ তুলে তাঁরা অবরোধ করেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ। প্রায় ছয় ঘণ্টার অবরোধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগ। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো চট্টগ্রামের জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া, নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা এবং সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি শোনার মধ্য দিয়ে তিনি সংকট নিরসনে উদ্যোগী হন। তাঁর আশ্বাসে অবশেষে অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা। তবে এখন বড় প্রশ্নÑমাইশার মৃত্যুর পর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পাবে?

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ডালাস পেট্রোল পাম্পের বিপরীতে ঘটে দুর্ঘটনাটি। লরির ধাক্কায় ৮ নম্বর রুটের একটি লোকাল বাস উল্টে গেলে চাঁপা পড়েন কয়েকজন শিক্ষার্থী। গুরুতর আহত হন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। আহত হন আরও দুই শিক্ষার্থী, যাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর ছিল বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাইশার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহপাঠীরা শুধু একজন বন্ধুকে হারানোর বেদনায় নয়, একই স্থানে ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কায় প্রতিবাদে নামেন। সকাল ১১টার দিকে শুরু হওয়া অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে যানজটের দৈর্ঘ্য ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। রেলপথ অবরোধের কারণে ঢাকাগামী ও চট্টগ্রামগামী ট্রেন চলাচলও ব্যাহত হয়। আটকা পড়ে সাধারণ যাত্রী ও অ্যাম্বুলেন্সসহ অসংখ্য যানবাহন।

শুরু থেকেই মানবিক উদ্যোগে জেলাপ্রশাসক

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নিহত মাইশার বাবা দিদারুল আলমের সঙ্গেও কথা বলে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি তুলে ধরার আগেই বিষয়গুলো সমাধানে প্রশাসনিক যোগাযোগ শুরু করেছিলেন বলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের জানান জেলাপ্রশাসক।

প্রথমে ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। কিন্তু শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতি দাবি করেন। তাঁদের দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান জেলাপ্রশাসক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

এ সময় মহাসড়কে অনুষ্ঠিত মাইশার জানাজায় অংশ নেন জেলাপ্রশাসক। সহপাঠীর নিথর দেহ সামনে রেখে শোকাহত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের বক্তব্য ও দাবিগুলো শোনেন তিনি। প্রশাসনের সর্বোচ্চ জেলা কর্মকর্তার সরাসরি উপস্থিতি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করে।

ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে লিখিত উদ্যোগের ঘোষণা

শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের চলাচল থাকা সত্ত্বেও মহাসড়কের এই অংশে নিরাপদে পারাপারের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

জেলাপ্রশাসক বলেন, ‘আমি আজকেই ফুটওভার ব্রিজের জন্য লিখিতভাবে জানাব, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এখানে ফুটওভার ব্রিজটি নির্মাণ করা যায়।’

শুধু ফুটওভার ব্রিজ নয়, সড়কের দুই পাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ, গতিরোধক স্থাপন এবং নিয়মিত পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েও উদ্যোগের কথা জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে রাখা ভারী যানবাহন সরানোর আশ্বাস দেন।

অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা

বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে কেডিএস ডিপোসহ বিভিন্ন স্থানে লরি ও ভারী যানবাহনের পার্কিং নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। তাঁদের দাবি, মহাসড়কের পাশে এসব যানবাহন রাখা হলে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

এ বিষয়ে জেলাপ্রশাসক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘কোনো অবৈধ পার্কিং এখানে থাকবে না। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি রাস্তা দখল করে লরি বা গাড়ি রাখে, সেগুলো আমড়া রাস্তায় রাখতে দেব না।’ রেললাইনের পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আশ্বাসও দেন তিনি। শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে মহাসড়ক ও রেললাইনের মধ্যবর্তী স্থানে অবৈধভাবে রাখা দুটি ট্রাক সরানো এবং সরকারি জায়গা দখল করে থাকা স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টিও ছিল।

লরি জব্দ, চালক পলাতকÑপুলিশের বক্তব্য

দুর্ঘটনার পরপরই চালককে গ্রেপ্তারের দাবি ওঠে। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম শিক্ষার্থীদের জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটি জব্দ করা হয়েছে, তবে চালক পালিয়ে গেছেন। তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মামলা দায়ের এবং তদন্তের অগ্রগতি শিক্ষার্থীদের অবহিত রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়। জেলা প্রশাসকও চালককে দ্রুত আইনের আওতায় আনার বিষয়ে পুলিশ সুপারের আশ্বাসের কথা জানান।

নিহতের পরিবারের ক্ষতিপূরণেও উদ্যোগ

মাইশার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই থেমে যায়নি, সহপাঠীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতা। শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে জেলাপ্রশাসক জানান, লরির মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকেও সহায়তা দেওয়া হবে।

আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং নিহতের পরিবারের পাশে থাকার বিষয়টিও প্রশাসনের উদ্যোগের অংশ বলে জানান তিনি।

আট দফা দাবিতে আন্দোলন, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছেÑবিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মামলা দায়ের ও তদন্তের অগ্রগতি জানানো, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লরিচালককে গ্রেপ্তার, চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, মহাসড়কের দুই পাশে গতিরোধক স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উভয় পাশে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ।

শিক্ষার্থীরা জানান, যেসব দাবি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে। অন্যথায় বুধবার থেকে পুনরায় মহাসড়ক অবরোধের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমিন আর রাজি গণমাধ্যমকে এ আলটিমেটামের কথা জানান।

আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার, এখন বাস্তবায়নের পরীক্ষা

দীর্ঘ অবরোধে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান জেলাপ্রশাসক। তিনি বলেন, ‘আমড়া আপনাদের কথা দিচ্ছি, আপনাদের যে দাবিগুলো আছে, সেগুলো আমড়া স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পূরণ করব।’

জেলা প্রশাসকের আশ্বাস, পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা। এতে প্রায় ছয় ঘণ্টার অচলাবস্থার অবসান ঘটে। তবে অবরোধ প্রত্যাহারের পরও যানবাহন চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগে।

প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই হবে বড় অর্জন

মাইশার মৃত্যু সীতাকুণ্ডের কুমিরায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেÑএকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর নিয়মিত যাতায়াতের স্থানে কেন এখনও নিরাপদ সড়ক পারাপারের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি? ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি, ভারী যানবাহনের পার্কিং এবং মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে আগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সরাসরি উপস্থিতি, শোকাহত পরিবারের খোঁজ নেওয়া, আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসায় উদ্যোগ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশাসনের মানবিক দায়িত্ব পালনের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তবে তাঁর দেওয়া আশ্বাসগুলো বাস্তবায়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মাইশাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তাঁর মৃত্যু যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরাপদ সড়ক, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ এবং অবৈধ পার্কিং বন্ধের কার্যকর পরিবর্তনের সূচনা করে, তবে সেটিই হবে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সবচেয়ে বড় মানবিক অর্জন। এখন সীতাকুণ্ডবাসী ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসকের আশ্বাস যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, দ্রুত দৃশ্যমান বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আর কোনো মাইশাকে যেন এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে