এক শতাংশ জমি, তার ওপর ছোট্ট একটি ঘর-এটুকুই ছিল স্বামীহারা হাজেরা বেওয়ার মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়। নিজের নামে নেই কোনো জমিজমা। পাঁচ মেয়ের মধ্যে দুজন বিধবা, তাঁদের সংসারেও অভাব-অনটন। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় কোনোমতে চলে তাঁর জীবন। দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ওই ঘরটুকুই ছিল তাঁর নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার ঝড়ে সেই ঘরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন ভাঙা ঘরের সামনে বসে চোখের পানি ফেলছেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের পর প্রকৃতির এই আঘাত যেন তাঁর জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নাটোরের লালপুর উপজেলার নবীনগর গ্রামে হাজেরা বেওয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সামনে বিষণ্ন মনে বসে আছেন তিনি। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে এসেছেন প্রতিবেশীরা। কিন্তু যে নারীর নিজের বলতে কিছুই নেই, তাঁর শেষ আশ্রয়টুকুও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সান্ত্বনার কথায় কি মেটে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা? হাজেরা বেওয়ার জীবনের গল্প দীর্ঘদিনের অভাব, বঞ্চনা আর সংগ্রামের। প্রায় ১৪ বছর আগে স্বামী জামাত মণ্ডল মারা যাওয়ার পর পাঁচ মেয়েকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। ছোট মেয়ের বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় স্বামীকে হারিয়ে অনেকটা একাই জীবনযুদ্ধে নামতে হয় তাঁকে। পুত্রসন্তান নেই, নিজের কোনো জমিজমাও নেই। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন কাটে তাঁর। পাঁচ মেয়ের মধ্যে দুজন বিধবা হওয়ায় তাঁদের দুঃখ-কষ্টও ভাবিয়ে তোলে এই মাকে। নিজের জীবন চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে মেয়েদের দুর্দশার খোঁজখবর রাখার চিন্তাও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। অভাবের এই বাস্তবতায় নিজের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ভূমিহীন ও অসহায় অবস্থায় জীবন কাটালেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাননি বলে জানিয়েছেন তাঁর প্রতিবেশীরা। শেষ পর্যন্ত এক হৃদয়বান ব্যক্তির দেওয়া এক শতাংশ জমিতে ছোট্ট একটি ঘর তুলে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু ঝড়ে সেই ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তিনি। এখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি নিরাপদ আশ্রয়। হাজেরা বেওয়ার প্রতিবেশী রবিউল ইসলাম রবি বলেন, “হাজেরা বেওয়া অত্যন্ত অসহায় একজন নারী। প্রায় ১৪ বছর আগে তিনি স্বামীকে হারিয়েছেন। তাঁর পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে নেই। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় অতি কষ্টে তাঁর জীবন চলে। নিজের কোনো জমিজমা নেই, যে জমিতে ঘর ছিল, সেটিও তাঁর নিজের নয়। এত অসহায় অবস্থায় থেকেও গত ১৫-১৬ বছরে তিনি কোনো সরকারি অনুদান পাননি।” তিনি আরও বলেন, “গত বছর স্থানীয় চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ রঞ্জু তাঁকে একটি বিধবা ভাতার কার্ড করে দিয়েছেন। তিন মাস পরপর ভাতার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও সর্বশেষ কিস্তির টাকা তাঁর মোবাইলে আসেনি।” ঈশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ রঞ্জু বলেন, “আগের সময়ে তিনি কী ধরনের সরকারি সহায়তা পেয়েছেন, তা আমার জানা নেই। তবে আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর অসহায়ত্বের কথা জেনে একটি বিধবা ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।”এ বিষয়ে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. মেশকাতুল ইসলাম বলেন, “আগামীকাল শুক্রবার ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।”হাজেরা বেওয়ার এই দুর্দশা শুধু একজন স্বামীহারা নারীর ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়; এটি ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের নিরাপদ আশ্রয় এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। বিধবা ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা হলেও তাঁর বসবাসের নিরাপদ জায়গা নেই। তার ওপর ঝড়ে ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে তাঁর বসবাসের উপযোগী নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিধবা ভাতার টাকা নিয়মিত পাচ্ছেন কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা দরকার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহায়তার আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে হাজেরা বেওয়ার জীবনে। ভাঙা ঘরের সামনে বসে থাকা এই নারীর এখন বড় কোনো চাওয়া নেই। তাঁর প্রয়োজন শুধু মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ ঘর, যেখানে অন্তত ঝড়-বৃষ্টির রাতে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন। দীর্ঘদিনের অভাব-অনটন আর বঞ্চনার পর এবার কি জুটবে তাঁর নিরাপদ আশ্রয়? সেই প্রত্যাশায় দিন কাটছে হাজেরা বেওয়ার।