বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তের অগ্রগতি ও মরদেহের ময়নাতদন্তের ফলাফল জানার পর এ বিষয়ে কথা বলবেন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণের সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি এই বিষয়ে এখন কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ, একটা প্রাথমিক তদন্ত হতে হবে আর লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে। তারপর আমরা সব বিষয় জেনে কথা বলব।”
বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ একাডেমিতে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচের মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
নৌ-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকাল পৌনে ৬টার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটের পাশ থেকে ভাসমান অবস্থায় তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ২৮ বছর। তিনি বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা জানতে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের যে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটি তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। ওই ভিডিও ধারণের কারণে বিমান বাহিনীতে তাঁর চাকরি চলে গিয়েছিল কি না, গত জুলাইয়ে একটি পডকাস্টে এমন প্রশ্ন করা হলে তাহসিফ বলেছিলেন, “হতে পারে।”
একই অনুষ্ঠানে ‘আমার দেশ’-এর একটি প্রতিবেদনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাঁর নাম আসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তাহসিফ বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছে, ওই প্রতিবেদন দিয়ে একটি প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
২০২৫ সালের ৪ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন নিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) প্রতিবাদ জানিয়েছিল। সংস্থাটি বলেছিল, তাহসিফসহ দুই কর্মকর্তাকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর দাবি সঠিক নয়। তাঁদের বিমান বাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হয়েছিল। ওই অভিযোগের সঙ্গে তাঁদের অবসরের সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে জানায় আইএসপিআর।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জনবল বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে বাহিনীকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, পুলিশ অপরাধী শনাক্ত, গ্রেপ্তার, তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে কাজ করছে। পুলিশের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ভালো কাজের জন্য পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। কেউ অপরাধে জড়ালে, বেআইনি কর্মকাণ্ড করলে কিংবা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এভাবে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী দিনেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুমের ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগকে নিয়ে যা বললেন
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ ফিরবে না। দলটি এখন নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল এবং জনগণ তাদের আবার রাজনীতিতে গ্রহণ করবে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, তারা কোনো দিন রাজনৈতিক দল ছিল না। কারণ, আওয়ামী লীগের ডিএনএর মধ্যে গণতন্ত্রের বীজ ছিল না। তারা একটি স্বৈরতান্ত্রিক ও মাফিয়া শক্তি ছিল। অরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।”
আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতি করতে চাইলে সরকার বিচলিত নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। যে-ই দেশে আসুক, আইন অনুযায়ী তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হবে।
নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যার ঘটনায় সংসদ সদস্যের ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। সংসদ সদস্যের সন্তান হলেও তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পার্বত্য অঞ্চলে সেনা মোতায়েন বাড়ানো নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাহাড়ের পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং সেখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে। মাঝেমধ্যে কিছু ঘটনা ঘটলেও শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোট সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা এবং সব ভোটারের স্বাধীন ও নিরাপদে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচের ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভয়ভীতি ও পক্ষপাতিত্ব এড়িয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে হবে। মানুষের পাশে থেকে কাজ করেই পুলিশকে সত্যিকার অর্থে জনগণের পুলিশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতের সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ বাহিনীকে দক্ষ, আধুনিক ও মানবিক সেবামুখী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন কেনা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই ব্যাচের সদস্যরা দেশসেবার পেশায় যোগ দিয়েছেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে বৈষম্য ও অন্যায়ের চর্চা থেকে দূরে থাকতে হবে।
পুলিশের পোশাক ও দায়িত্বকে শুধু চাকরি হিসেবে না দেখে জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধকে পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এসব অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক তদন্ত, তথ্য বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল ফরেনসিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার, পক্ষপাতিত্ব ও পেশিশক্তির পরিবর্তে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে বলেও জানান তিনি। সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষার নির্দেশনা দেন নবীন কর্মকর্তাদের।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে কাজের সুযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্বে অবহেলা, অনৈতিক কাজ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধানও কার্যকর থাকবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সমাপনী কুচকাওয়াজে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচের ১৬২ জনসহ মোট ২৪৬ জন প্রশিক্ষণার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচে বেস্ট সার্জেন্ট হয়েছেন মোহা. ওমর ফারুক, বেস্ট একাডেমিক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ সাইফুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার মোহা. আসাদুজ্জামান।
অন্যদিকে, ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচে বেস্ট ক্যাডেট হয়েছেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বেস্ট একাডেমিক মো. বোরহানুল ইসলাম, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ দেওয়ান গোলাম রসুল এবং বেস্ট শ্যুটার মো. কামাল গনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা, পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মো. মাইনুল হাসান, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা মো. রেজাউল আলম সরকার এবং রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক মো. আশিক সাঈদ। এ ছাড়া সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি, প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবক এবং সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। এএসপি প্রবেশনার মো. মাহবুব হোসেন প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।