১৮৮১ সালে যখন বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন। দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে প্রায় দেড় শতাব্দী (১৪৫ বছর)। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শৈলকুপার ঐতিহ্যবাহী নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আলোকিত হয়েছেন বহু প্রজন্ম। তবে দীর্ঘ এই পথচলায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলালেও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি বিদ্যালয়টির জরাজীর্ণ অবকাঠামোর। বর্তমানে ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো ভবনের নিচে চরম আতঙ্ক আর মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন পাঠগ্রহণ করছে শৈলকুপা উপজেলার বগুড়া ইউনিয়নের নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির অবস্থা কতটা করুণ। ছাদ জুড়ে প্রকট ফাটল, চটে গেছে পলেস্তারা, আর ভেতরে জং ধরা রডগুলো যেন যেকোনো মুহূর্তের বড় কোনো দুর্ঘটনার সংকেত দিচ্ছে। একটু বৃষ্টি হলেই শুরু হয় অবর্ণনীয় ভোগান্তি। ক্লাসরুমে বৃষ্টির পানি পড়া ঠেকাতে ছাদে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে পলিথিন! কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয় না; ছাদ চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের পরনের পোশাক আর বই-খাতা। কেবল বৃষ্টিই নয়, তীব্র গরমে জরাজীর্ণ ছাদের উত্তাপ শ্রেণিকক্ষগুলোকে যেন একেকটি 'হিট চেম্বারে' পরিণত করে।
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় পাঁচশত, অথচ তাদের বসার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। কক্ষ সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের ব্যবহৃত অন্ধকার স্টোররুমেই গাদাগাদি করে বসাতে হয় শিক্ষার্থীদের। ভাঙা ব্লাকবোর্ড আর ভাঙা দরজা-জানালাই এখানকার দৈনন্দিন বাস্তবতা। এছাড়া একটু বৃষ্টিতেই খেলার মাঠ তলিয়ে যায় পানিতে; ফলে অ্যাসেম্বলি তো দূরের কথা, বন্ধ থাকে শিশুদের প্রাত্যহিক খেলাধুলাও।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সেজুতি আকুতি জানিয়ে বলে, অন্যদের স্কুল কত সুন্দর! আর আমাদের মাথার ওপর থেকে বালি-খোয়া খসে পড়ে। বৃষ্টি এলেই বই-খাতা ভিজে যায়। আর আমাদের আতঙ্কে ক্লাস করতে হয়, খুই খারাপ লাগে! আমরা অন্তত একটা নিরাপদ ভবন চাই। শিক্ষার্থীদের এমন করুণ পরিস্থিতি দেখে অভিভাবক রানা হাসানসহ স্থানীয়রা জানান, জরাজীর্ণ ভবনের ভয়ে অনেকেই আজকাল সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে সাহস পান না। এভাবে চলতে থাকলে অবধারিতভাবেই ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাবে। ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি অচিরেই উঠবে শূণ্যের কোঠায়।
বিদ্যালয়ের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার ১৪৫ বছরেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্থায়ী আধুনিক একাডেমিক ভবন মেলেনি এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে। ১৯৮০ সালে একটি বিজ্ঞান ভবন এবং ১৯৯৭ সালে একটি ছোট ভবন করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো এখন পরিত্যক্তপ্রায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রদীপ মন্ডল ও সুমন রানা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, রুমের অভাবে স্টোররুমে দাঁড়িয়ে ক্লাস নিতে হয়, ভাঙা বোর্ডে লেখা যায় না। এই জরাজীর্ণ অবস্থা দূর করতে একটি নতুন আধুনিক ভবন এবং ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয়করণ করা এখন সময়ের দাবি।
প্রধান শিক্ষক মুকুল হোসেন বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোমলমতি শিশুদের ক্লাস নিচ্ছি। প্রতি মুহূর্তেই ভয় হয়-কখন ঝুঁকিপূর্ণ দিলান বা জরাজীর্ণ ছাদ ধসে পড়ে! একাধিকবার আবেদন করেও এতদিন কোনো কাজ হয়নি, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকায় নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি আমাদের নজরে আছে। সম্প্রতি আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। আশা করছি, খুব দ্রুতই এখানে একটি নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।