সুমীর জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতি মিললেও মিলেনি একটি স্থায়ী থাকার ঘর

এফএনএস (শাকিল আহমেদ শাহরিয়ার; শেরপুর) : | প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম
সুমীর জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতি মিললেও  মিলেনি একটি স্থায়ী থাকার ঘর

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস-২০২৫ উদযাপন উপলক্ষে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত দেশব্যাপী পরিচালিত ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ কার্যক্রমের আওতায় ‘নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবনসংগ্রামে’ ক্যাটাগরিতে নকলা উপজেলায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পুরস্কার অর্জন করেন সুমী বেগম। জীবনসংগ্রামে তার এই অর্জন কিছুটা আনন্দ দিলেও থাকার মতো একটি স্থায়ী ঘর না থাকায় সেই আনন্দ যেন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

জানা গেছে ,  সুমী বেগম  ১৩ বছর আগে স্বামীর ঘর ছেড়ে তিন মাসের কোলের শিশুকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে এসেছিলেন । নেশাগ্রস্ত স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত তালাকের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন তিনি। স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করলেও দুঃখ ঘোচেনি সুমীর। বছরের পর বছর চোখের জল আর ধৈর্যের সংমিশ্রণে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দিন কাটিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তিন মাসের সেই শিশু সৌরভ (১৩) এখন নকলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছেলেকে মানুষ করার জন্যই সুমী দ্বিতীয় বিয়ে করেননি । সুমীর বাবা ফারুক মিয়া একজন অটোচালক। ফারুক মিয়ার নিজের সংসার চালাতেই যখন হিমশিম খেতে হয়, তখন সুমী ও তার ছেলের ভরণপোষণ যেন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’।

পরিবারের আয় বাড়ানো এবং ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কয়েক বছর আগে সেলাই মেশিনে কাপড় তৈরির কাজ শুরু করেন সুমী বেগম।

শেরপুরের নকলা উপজেলার পৌর শহরের জালালপুর এলাকার বাসিন্দা সুমী এখন বাবার সংসারেই ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন।

সুমীর বাবার সংসারে স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, সুমী ও তার ছেলে-সব মিলিয়ে ৬ জনের সংসার। শুধু ভরণপোষণ নয়, বাবার সংসারে রয়েছে থাকার ঘরেরও সংকট। অটো চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে ডাল-ভাত খেয়ে দিন কাটে। নতুন করে আরেকটি ঘর নির্মাণ করার সামর্থ্য নেই তার বাবার।

 কিছুটা সহযোগিতা করতে বাবার সংসারে  সেলাইয়ের কাজ করেন সুমী। এতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। কিন্তু এই সামান্য আয় দিয়ে নিজের ও ছেলের খরচ চালানোর পাশাপাশি সৌরভের পড়াশোনার খরচ বহন করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নতুন ঘর নির্মাণের কথা চিন্তা করার সুযোগও নেই। বাধ্য হয়ে বাবার ঘরেই ছেলেকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

সুমী বেগমের এই করুণ চিত্র দেখে মর্মাহত স্থানীয়রা। তারা সরকারের কাছে সুমী বেগম ও তার ছেলের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সুমী বেগম তার পুরষ্কার ও সনদপত্র দেখিয়ে বলেন, যার থাকার ঘর নাই তার পুরষ্কার দিয়া কি অইবো। সেলাই মেশিন চালাইয়া যে টেহা পাই তা দিয়ে পোলার খরচই চলে না। ওর বাপে ডিভোর্সের পর থেকে আজ পর্যন্ত ছেলের লাইগা ৫ পয়সাও খরচ দেয় নাই। ১৩টা বছর ধরে কষ্ট করতাছি। পুলা বড় হইছে, আমার বুড়া বাপের ঘরে আর কতদিন থাকমু। সরকার থাইকা যদি একটা ঘর পাইতাম. খুবই উপকৃত হতাম। তিনি আরও বলেন, শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পুরস্কারের এই ক্রেস্ট আর সনদ আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি-এটাই আমার ১৩ বছরের জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতি। কষ্টের দিনগুলোতে এই স্বীকৃতিই আমাকে নতুন করে সাহস জোগায়, ছেলের স্বপ্ন পূরণের লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।

শেরপুর জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, অদম্য পুরষ্কার পাওয়া নারীর ঘর না থাকার বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে