দারিদ্র্যের সংসারে একটু স্বস্তির আশায় ঋণ নিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, সেই ঋণের টাকায় হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে সংসারের চাকা। কিন্তু অভাবের সংসারে কিস্তির বোঝা ক্রমেই ভারী হয়ে উঠেছে। একসময় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় সেই ঋণই যেন হয়ে দাঁড়াল জীবনের অভিশাপ। শেষ পর্যন্ত কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারের যেতে হলো সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটার এক নারীকে।
গ্রেপ্তার ওই নারীর নাম মমতাজ বেগম। তিনি পাটকেলঘাটা থানার তৈলকুপি গ্রামের শাহাজাহান সরদারের স্ত্রী। রোববার দিবাগত রাতে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পাটকেলঘাটা থানা পুলিশ।
জানা যায়, অভাব-অনটনের সংসারে প্রয়োজন মেটাতে মমতাজ বেগম একটি এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করেন। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের চেষ্টা করলেও সংসারের টানাপোড়েন ও আর্থিক সংকটের কারণে এক পর্যায়ে তিনি নিয়মিত কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। এ ঘটনায় পাটকেলঘাটা থানা সদর এলাকায় অবস্থিত এনজিও উন্নয়ন প্রচেষ্টা কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় পাটকেলঘাটা থানা পুলিশ রোববার রাতে মমতাজ বেগমকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। মমতাজের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জীবনের কঠিন বাস্তবতায় ঋণ নিয়ে যারা সংসারের হাল ধরতে চান, তাদের অনেকেই নিয়মিত কিস্তি দিতে না পারলে আইনি জটিলতায় পড়েন। বিশেষ করে গ্রামের অসহায় ও সহজ-সরল নারীদের জন্য ঋণের কিস্তি অনেক সময় আশীর্বাদের পরিবর্তে পরিণত হয় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে। একদিকে সংসারে নিত্যদিনের অভাব, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের কিস্তি, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে অনেক দরিদ্র পরিবার যেন ক্রমেই ঋণের জালে আটকে পড়ছে। কিস্তির টাকা জোগাড় করতে কেউ ধার করেন, কেউ আবার অন্য জায়গা থেকে ঋণ নেন। এভাবেই এক ঋণ শোধ করতে গিয়ে আরেক ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।
মমতাজ বেগমের ঘটনাটি তাই শুধু একজন নারীর গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়; এটি গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের ঋণনির্ভর জীবনের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যে হাতে সংসারের চুলা জ্বলে, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলে, সেই হাতেই একদিন ওঠে কারাগারের শিকল,কিস্তির কয়েকটি টাকার দায়ে।
প্রশ্ন উঠছে, দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশায় নেওয়া ক্ষুদ্রঋণ যখন দরিদ্র মানুষের জীবনেই নতুন সংকট তৈরি করে, তখন তাদের জন্য মানবিক ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা কতটা জরুরি ? ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, দুর্যোগ বা বাস্তব সংকট বিবেচনায় নিয়ে পুনঃতফসিল কিংবা সময় দেওয়ার সুযোগ আরও কার্যকর করা যায় কি না, সেটিও এখন ভাবার সময় এসেছে।
কারণ, দরিদ্র মানুষের হাতে ঋণ তুলে দেওয়া সহজ; কিন্তু সেই ঋণের বোঝায় একটি অসহায় পরিবার যখন ভেঙে পড়ে, তখন তার দায় শুধু কাগজের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না বলে স্থানীয় অভিজ্ঞমলের ধারণা।