“ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে” সত্যিই কি এটি প্রাপ্তির বাক্য?

এফএনএস (মোঃ সাইফুল ইসলাম; বাবুগঞ্জ, বরিশাল) : | প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:১৮ এএম
“ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে” সত্যিই কি এটি প্রাপ্তির বাক্য?

“ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে”-শুনতে একদিকে যেমন মাধুর্যপূর্ণ, তেমনি আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি প্রাপ্তিময় বাক্য। সাধারণ পারিবারিক প্রেক্ষাপটে এই কথাটির অর্থ গভীর আবেগে ভরা। ধরুন, পরিবারের কোনো এক সন্তান রাগ কিংবা অভিমানে ঘর ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে পরিবার, বিশেষ করে অভিভাবকেরা শোকাতুর হয়ে পড়েন। সময়ের ব্যবধানে সেই শোক কিছুটা প্রশমিত হয়।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই সন্তান আবার পরিবারে ফিরে এলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের মধ্যে সাময়িক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই উচ্ছ্বাস কি সব সময় যৌক্তিক? যে সন্তান পরিবারের দুঃসময়, অভিভাবকের কষ্ট কিংবা দায়িত্বের কথা চিন্তা না করে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে ফিরে এলেই কি তার কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করা যায়? বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন কথাই বলে। ঠিক তেমনি রাজনীতির অঙ্গনেও আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিচিত বাক্য শুনে আসছি “ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে।” আমার দৃষ্টিতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বাক্যটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এক ধরনের চাটুকারিতাপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর শব্দবন্ধ ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ সাধারণভাবে প্রত্যাশা করা হয়-একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী কোনো দলের আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা ও গঠনতন্ত্রে অনুপ্রাণিত হয়েই রাজনীতিতে যুক্ত হবেন। সে দল হতে পারে জনকল্যাণমূলক, আদর্শিক ও নৈতিকতায় দৃঢ়। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে আমরা প্রায়ই ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনো দল যখন ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করে এবং সুসময়ের তীব্র স্রোতে ভাসে-ঠিক তখনই কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি নিজের বৃহৎ স্বার্থের লোভে সেই দলে ঢ়ুকে পড়ে। তারা দলকে ব্যবহার করে, চেটেপুটে খায়, নিজের আখের গুছিয়ে নেয়। দলীয় আদর্শ তখন তাদের কাছে সম্পূর্ণ গৌণ হয়ে যায়। সময়ের বিবর্তনে পালা বদল হয়। দল চলে যায় দুঃসময়ে। আর ঠিক তখনই সেই তথাকথিত ‘ঘরের ছেলে’ দলকে ফুটবলের মতো কিক মেরে ছুড়ে ফেলে দেয় ক্ষমতার মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়ানো অন্য দলে। সেখানে গিয়েও শুরু হয় নতুন করে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার প্রচেষ্টা-ম্যানেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ-পদবি ও নানা সুবিধা আদায়ের প্রতিযোগিতা। পরবর্তীতে আবার যখন রাজনৈতিক বাতাসের দিক পরিবর্তন হয়, তখন শোনা যায় সেই পুরোনো বুলি- “ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে।” ইদানীং বাবুগঞ্জ উপজেলায় এই দৃশ্য খুবই পরিচিত হয়ে উঠেছে। দলবদলের এক ধরনের পালা চলছে। মামলা, হামলা কিংবা হয়রানি থেকে বাঁচতে ক্ষমতার মসনদ হারানো বা কিছুটা বেকায়দায় থাকা দল ছেড়ে অন্য দলে যোগদান, কিংবা আবার ফিরে আসার ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর এসব ঘটনাকে বৈধতা দিতে তথাকথিত কিছু রাজনৈতিক নেতা নির্বিঘ্নে ব্যবহার করছেন ; “ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে”ধরনের শব্দচয়ন। আপাতদৃষ্টিতে এই বাক্যটি আবেগঘন মনে হলেও, বাস্তব প্রেক্ষাপটে এটি আজ একেবারেই ঘৃণিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ যে ব্যক্তি দলের সুসময়ে দলকে নিঃস্ব করে নিজে হয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আবার দুঃসময়ে দলকে পরিত্যাগ করেছে-সে ফিরে এলেই কি দল বা রাজনীতির জন্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনে?  বরং এটি চাটুকারিতা, লোভ-লালসা ও ক্ষমতার মোহের এক নগ্ন প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং বলা যায়, তথাকথিত ‘ঘরের ছেলে’ যদি আবার ঘরেও ফিরে আসে, তার পেছনে অধিকাংশ সময় কাজ করে আদর্শ নয়- কাজ করে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার লোভ, আর সুবিধাবাদী রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে