বরিশাল সিটি করপোরেশনে (বিসিসি) নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্ব সনদ ও জন্ম নিবন্ধনের মতো প্রয়োজনীয় সেবা পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে।
বিসিসি সূত্রে জানা গেছে, জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব ১৬ জন সরকারি কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তবে নিজ নিজ দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত এই দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ফলে একদিকে সেবাপ্রার্থীদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবা কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে ওয়ার্ড কার্যালয়গুলোতে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় জটিল হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহ করতে একাধিকবার কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে। কখনো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যস্ততা, কখনো কাগজপত্র যাচাইয়ের দীর্ঘসূত্রতা, সব মিলিয়ে জরুরি কাজে সেবা নিতে এসে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে চাকরির আবেদন, জমি সংক্রান্ত কাজ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রয়োজনে সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সময়ের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাব্বির গাজী বলেন, পাসপোর্ট করার জন্য নাগরিক সনদপত্র প্রয়োজন ছিল, কিন্তু ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে দাপ্তরিক কর্মকর্তা না থাকায় একটি স্বাক্ষরের জন্য ১৭ দিন ঘুরতে হয়েছে। অবস্থা এমন যে, কমিশনারের সার্টিফিকেট পেতে পেতে অনেকের চাকরি বা অন্যান্য আবেদনের মেয়াদও শেষ হয়ে যায়।
নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আফসানা বেগম বলেন, স্বামীর মৃত্যু সনদ তুলতে গিয়ে এক সপ্তাহ ঘুরতে হয়েছে। কয়েকদিন ঘুরেছি তাদের সার্ভার ডাউন, এরপর যখন সনদ প্রিন্ট হয়েছে তখন তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছুটিতে ছিলেন। এক সপ্তাহ পর মৃত্যু সনদ হাতে পেয়েছি।
নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, মেয়ের জন্য জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে জানতে পারি আগে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন অনলাইন করতে হবে। তারপর নিজেদের জন্মনিবন্ধন করার পরে মেয়ের জন্মনিবন্ধনের আবেদন করেছি। এজন্য কতোটা দৌড়ানো লাগছে তা আর বলে কী হবে! ভোটার আইডি কার্ড থাকার পরেও অনলাইন জন্মনিবন্ধন কেন লাগবে? এ দেশের যতো উল্টাপাল্টা আইন কানুন!
অন্যদিকে, ওয়ারিশ সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রদানের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সময় নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ধরনের সনদ প্রদানের আগে তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন হলেও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সেবাপ্রার্থীদের। তাই সনদের সত্যতা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা বজায় রেখেই দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম বলেন, ওয়ারিশ সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেছিলাম, কিন্তু যে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা ওয়ারিশ সার্টিফিকেট নিয়ে বড়ই ঝামেলা করেন। কারণ তারা ওয়ার্ডের কাউকে ঠিকমতো চেনেন না। ফলে তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে করতেই দীর্ঘ একটা সময় পার হয়ে যায়। ওয়ার্ডে কাউন্সিলর না থাকায় সাধারণ নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা পেতেও খুবই ভোগান্তি পোহাতে হয়। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, কাউন্সিলর কার্যালয়ের কাজ শুধু বিভিন্ন সনদ দেওয়া বা প্রশাসনিক কাগজপত্রে স্বাক্ষর করা নয়। স্থানীয় পর্যায়ে জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন ছোটখাটো সমস্যা সামাজিকভাবে মীমাংসার ক্ষেত্রেও জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফারদিন ইসলাম বলেন, ওয়ার্ডে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন নগরবাসী। কারণ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অপরিচিত হওয়ায় সালিশি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে অনেকেই ছোটখাটো বিরোধের ক্ষেত্রেও থানা বা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষের যেমন সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে।
সূত্রমতে, প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটি করপোরেশনে ১০ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরসহ মোট ৪০টি কাউন্সিলর পদ রয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব এখন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। নগরবাসীর দাবি, নাগরিক সেবা নির্বিঘ্ন রাখতে দ্রুত পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে অথবা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে ওয়ার্ড পর্যায়ে জবাবদিহিমূলক সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সনদ প্রদান ও অন্যান্য নাগরিক সেবার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিষদ ভেঙে দেওয়ার পর ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবা সচল রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারি কর্মকর্তাদের। কিন্তু মূল দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সব সময় ওয়ার্ড কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এতে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের ভোগান্তি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে জমে থাকছে বিভিন্ন আবেদন ও নথিপত্র।
কাউন্সিলর কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, নিজ নিজ দপ্তরের নিয়মিত কাজের চাঁপ সামলে সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন তারা। নাগরিকদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। তবে কিছু সনদের তথ্য ও সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে সময় লাগছে।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মীর মুহাম্মদ জাহিদুল কবির তুহিন বলেন, নাগরিকত্ব ও জন্মনিবন্ধন এই দুইটা সেবার জন্যই বেশি সংখ্যায় মানুষ আসে। আমি সবসময় দিনেরটা দিনের মধ্যে করে দেওয়ার চেষ্টা করি। বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে আমাদের ওপর যে দায়িত্বগুলো দেওয়া রয়েছে, সেগুলো পালনে আমরা সচেষ্ট থাকি। আমাদের মূল দাপ্তরিক কাজের বাইরেও আমরা কাজগুলো করার চেষ্টা করি। এ ব্যাপারে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রুম্পা সিকদার বলেন, আমাদের অফিস থেকে তদারকি আরও বাড়ানো হবে। কীভাবে নাগরিকদের সেবাটা তাদের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, সেজন্য আমরা বদ্ধপরিকর।