১৯৭১ সালে একজন শিক্ষার্থীর পিতা ও ভাইকে হত্যার কথা জানিয়ে গুরুদয়াল মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বরাবরে এক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার বেতন মওকুফের করুণ আবেদনের চিঠিটি পুরনো পেপার পত্রিকার ভাজ থেকে সংরক্ষণে রেখেছি বসার টেবিলে। শুধু তাই না দেশ বিদেশের নানা দুর্লভ বাংলা, আরবী ফার্সি ইংরেজিসহ অনেক ভাষার পুরনো বইয়ের এক সংগ্রাহকের নাম শরিফুল ইসলাম। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিম হারুয়া এলাকায় শরিফুল ইসলাম নামের এই সংগ্রাহক তীলে তীলে গড়ে তুলেছেন এক অনন্য সংগ্রহশালা। ব্যক্তিগত এই সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে ৫০০ বছরের পুরোনো হস্তলিখিত তুলট কাগজের পুঁথি থেকে শুরু করে নানা বই পত্রিকা। শরিফুল ইসলাম ২৪ অক্টোবর এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তাঁর এই সংগ্রহশালায় প্রাচীন পাঠ্যবই, সত্তরের দশকের বিভিন্ন পত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ের টিকিটসহ নানা দুর্লভ সামগ্রী স্থান পেয়েছে।
স্থানীয়ভাবে ‘পুরোনো বুকশপ’ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ওল্ড কালেকশন’ নামে পরিচিত এই সংগ্রহশালাটি কিশোরগঞ্জ শহরের কসাইখানা সড়কের পাশে একটি ভাড়া করা ছোট দোকানঘরে অবস্থিত। প্রতিবেশী অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম ফকির মতি জানিয়েছেন, শরিফুল ইসলামের বয়স ৩৮ বছর এবং তিনি নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলার বাসিন্দা হলেও ১২ বছর ধরে কিশোরগঞ্জে বসবাস করছেন। বিয়েও করেছেন কিশোরগঞ্জের ইটনার হাওরাঞ্চলে। স্ত্রী জেসমিন আক্তার একজন গৃহিণী। পুরোনো বই-পুস্তক আর দুর্লভ জিনিসপত্র সংগ্রহে স্ত্রীও তাঁকে উৎসাহ দিয়ে আসছেন। তাঁদের লাবিবা আক্তার ও জায়েন জিসান নামের দুটি সন্তান রয়েছে।
সংগ্রাহক শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হাওরাঞ্চলে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, ৪০-৫০ বছর আগের পুরোনো পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলো কেটে টুকরো করে বিড়ি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারকগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি সারা দেশ থেকে পুরোনো বই ও দুর্লভ সামগ্রী সংগ্রহ করেন।
প্রথমে তিনি এগুলো একটি গুদামঘরে রাখেন এবং পরে সেখান থেকে বাছাই করে সংগ্রহশালায় প্রদর্শন করেন। তাঁর এই সংগ্রহে বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার পুরোনো বই ও পত্রিকা রয়েছে। এছাড়া ব্রিটিশ আমলের ট্রাংক, পুরোনো টেলিফোন সেট, পাম্প লাইট, ক্যাসেট প্লেয়ার, সাদাকালো টেলিভিশন এবং বিভিন্ন ধাতব মুদ্রা ও হাতে লেখা গুরুত্বপূর্ণ চিঠিও তাঁর সংগ্রহে রয়েছে। ফেসবুকে ‘ওল্ড কালেকশন’ নামে শরিফের একটি পেজ আছে। সেখানে দুষ্প্রাপ্য বইসহ দুর্লভ নানা জিনিসপত্রের ছবি দেন তিনি। এখান থেকে দেখে অনেকে সেগুলো কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। যে জিনিস দুটি বা বেশি থাকে, একটি রেখে সেগুলো বিক্রি করে দেন।
দুর্লভ কিছু বই অনেক বেশি দামে কিনতে চাইলেও শরিফ বিক্রি করতে চান না। তবে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ পত্রিকার একটি সংস্করণ এক প্রবাসী লেখকের কাছে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এই পত্রিকাটি ‘দৈনিক পাকিস্তান’ নামে প্রকাশিত হতো। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে রচিত গোয়েন্দা উপন্যাস ‘দুষ্টগ্রহ’ নামে একটি বই এক অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসীর কাছে ৪০ হাজার টাকায় তিনি বিক্রি করেন। আছে পাম্প লাইট, পুরোনো টেলিফোন সেট, ৬০ থেকে ৭০ হাজার পুরোনো বইপত্র সংগ্রহ করেছেন শরিফ। রয়েছে বহু বছর আগে হাতে লেখা বিভিন্নজনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ও সাড়াজাগানো চিঠিও। বইপত্র ও পত্রিকা-ম্যাগাজিন ছাড়াও আরও নানা পুরোনো জিনিসপত্র রয়েছে শরিফের সংগ্রহে। শেলফে সাজানো পুরোনো কম্পিউটার, টেপ রেকর্ডার, পাম্প লাইট, ব্রিটিশ আমলের ট্রাংক, পুরোনো থালাবাসন, ক্যাসেট প্লেয়ার, টেলিফোন সেট ও পুরোনো সেই সাদাকালো টেলিভিশন। এ ছাড়া রয়েছে পুরোনো অনেক ধাতব মুদ্রা।
শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি নিজের জীবনের শ্রম ও ঘাম দিয়ে এই সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন এবং অনেকে এখান থেকে উপকৃত হচ্ছেন বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। বর্তমানে এই সংগ্রহশালাটি কেবল একটি দোকান নয়, বরং ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে স্থানীয় ও দূরদূরান্তের মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। সংগ্রাহকের এই কাজটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবী।