বীরগঞ্জে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সমপ্রীতির বন্ধনে মিলনমেলা

এফএনএস (আবুল হাসান জুয়েল; বীরগঞ্জ, দিনাজপুর) : | প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
বীরগঞ্জে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সমপ্রীতির বন্ধনে মিলনমেলা

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী আদিবাসীর মিলন মেলায় মানুষের ঢল নেমেছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এ মেলায় দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাঁওতালসহ নানা আদিবাসী সমপ্রদায়ের মানুষ অংশ নেন। দীর্ঘদিন পর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়া, আনন্দ ভাগাভাগি এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য উদ্যাপনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ মেলাকে ‘বউ মেলাথ কিংবা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা হিসেবে প্রচার করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট সমপ্রদায়ের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, এ ধরনের প্রচারের সঙ্গে মেলার প্রকৃত উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি কোনো জীবনসঙ্গী নির্বাচন কিংবা বিয়ের আয়োজন নয়; বরং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সমপ্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা। আয়োজক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হিন্দু সমপ্রদায়ের বিজয়া দশমীর পরদিন প্রতিবছর এ মেলার আয়োজন করা হয়। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে চলে আসা এ ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি দূরে থাকা আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগ তৈরি করাই মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে মাঠজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আদিবাসী নারী রিনা হেমব্রম বলেন, গত তিন বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ মেলা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, এখানে কোনো মেয়েকে পছন্দ হলেই বিয়ে করা যায়। বাস্তবে এ ধরনের কোনো প্রথা বা আয়োজন নেই। তিনি বলেন, এ অপপ্রচারে সাঁওতাল সমপ্রদায়ের মানুষের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। রিনা হেমব্রম আরও বলেন, নিজেদের শেকড় ও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে ধারণ করতেই প্রতিবছর এ মেলার আয়োজন করা হয়। এখানে মানুষ একে অপরের সঙ্গে দেখা করেন, আনন্দ ভাগাভাগি করেন এবং নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা করেন। এ আয়োজনের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান। সাঁওতাল সমপ্রদায়ের শ্যামলী মুর্মু বলেন, মেলাটিতে ছেলে-মেয়েদের পছন্দের ভিত্তিতে বিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং একসঙ্গে আনন্দ উদ্যাপন করাই এ আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলাটিকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা বাস্তব চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। নীলফামারী থেকে মেলায় ঘুরতে আসা জাকারিয়া পিন্টু জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলাটি সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের তথ্য জেনে তিনি এখানে এসেছিলেন। সরেজমিনে এসে দেখেছেন, এটি মূলত আদিবাসী সমপ্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মিলনমেলা। এখানে জীবনসঙ্গী খোঁজার নামে প্রচারিত কোনো আয়োজন তাঁর চোখে পড়েনি। মেলার আয়োজক বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুন বলেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এ মেলা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, নাচ, গান ও সংস্কৃতিকে সবার সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যেই প্রতিবছর এ আয়োজন করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলাটিকে ‘বউ মেলাথ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলাথ হিসেবে পরিচিত করার পরিবর্তে এর প্রকৃত ইতিহাস, সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও সামাজিক ভূমিকা তুলে ধরা প্রয়োজন। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সমপ্রীতির বন্ধনে আয়োজিত গোলাপগঞ্জের এ মেলা স্থানীয় আদিবাসী সমপ্রদায়ের কাছে কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়, বরং নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাই বিভ্রান্তিকর প্রচারের পরিবর্তে মেলার প্রকৃত পরিচয় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে