প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট। উঁচু-নিচু পাহাড়ের বুকে বিস্তীর্ণ সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি ঝরনার কলতান আর পাথরঘেরা স্বচ্ছ পানির ধারা-সব মিলিয়ে পর্যটকদের কাছে বরাবরই আকর্ষণীয় এই জনপদ। টানা পাঁচ দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে এবারও সিলেটের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। পূজার ছুটিতে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায় ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তবে পর্যটকদের এই বাড়তি উপস্থিতির বিপরীতে দেখা দিয়েছে আবাসন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ। হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টে কক্ষ না পেয়ে অনেক পর্যটক রাত কাটাচ্ছেন আত্মীয়স্বজনের বাসাবাড়িতে। কেউ কেউ হোটেলে কক্ষ খালি হওয়ার অপেক্ষায় থাকছেন অভ্যর্থনা কক্ষে কিংবা দরগাহ এলাকার খোলা মাঠে। এদিকে বাড়তি পর্যটকের সুযোগ নিয়ে কিছু সিএনজিচালক, হোটেল মালিক ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া ও মূল্য আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক পর্যটক। বাড়তি খরচের চাপে পাঁচ দিনের ছুটিতে বেড়াতে এসেও তিন দিনের মাথায় ফিরে যাচ্ছেন অনেকে। জামালপুর থেকে সিলেটে বেড়াতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী রাসেল আহমদ বৃহস্পতিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত শেষে জানান, তিনি জাফলং ও সাদাপাথর ঘুরে দেখেছেন। সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় সিলেটে আর অবস্থান করতে চান না তিনি। আত্মীয়ের বাসায় রাত কাটিয়েছেন বলেও জানান এই পর্যটক।কুমিল্লা থেকে পরিবার নিয়ে সিলেটে বেড়াতে আসা কাজী ইকবালের সঙ্গে কথা হয় মালনীছড়া চা-বাগানে। তিনি উঠেছেন হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার গেটের জমজম আবাসিক হোটেলে। তাঁর অভিযোগ, নন-এসি কক্ষের জন্য প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ টাকা। তাঁর দাবি, সাধারণ সময়ে এ ধরনের কক্ষের ভাড়া অনেক কম থাকে। এ ছাড়া হোটেল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের লাক্কাতুরা চা-বাগানে যেতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভাড়া দিতে হয়েছে ৩০০ টাকা। সাধারণ সময়ে এই পথের ভাড়া দেড়শ টাকার মধ্যে থাকার কথা বলে জানান তিনি।দর্শনীয় স্থান ও রেস্টুরেন্টে বাড়তি ভিড় সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে অবস্থিত হাসন রাজা মিউজিয়ামেও বেড়েছে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। মিউজিয়ামের কর্মকর্তা মাহবুব রহমান শেখ জানান, টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটির কারণে অন্যান্য সময়ের তুলনায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। এ কারণে ব্যস্ত সময় পার করছেন মিউজিয়ামের কর্মীরা। অন্যদিকে, নগরীর জিন্দাবাজার এলাকার পরিচিত খাবারের প্রতিষ্ঠান পানসী ও পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টেও পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব রেস্টুরেন্টে চলছে খাবার পরিবেশন ও ক্রেতাদের আনাগোনা। পানসী রেস্টুরেন্টের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আহমদ জানান, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও খাবারের মান বজায় রেখে তাঁরা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন না। ছুটির সময়ে ভর্তা, ভাজি ও মাছের চাহিদা বেশি। বিশেষ করে রুই, রোয়াল ও চিংড়ি মাছের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে। ভাত ও ডালসহ বিভিন্ন খাবারের প্যাকেজ ২০০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।কক্ষভাড়ায় পরিবর্তন নেই বলে হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি সিলেট নগরীর মধ্যম মানের আবাসিক হোটেল গোল্ডেন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিষ্টু দত্ত জানান, তাঁদের হোটেলে নন-এসি কক্ষের ভাড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং এসি কক্ষের ভাড়া ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। অনেক অতিথি আগেই কক্ষ বুকিং দিয়েছেন। অতিথির সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের হোটেলে কক্ষভাড়ায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। বাসের টিকিটেও চাপ, রাতের অধিকাংশ আসন বুকড পর্যটকদের বাড়তি চাপ পড়েছে দূরপাল্লার বাস চলাচলেও। দরগাহ গেট এলাকার ইউনিক পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার সাঈদ আহমদ জানান, পাঁচ দিনের ছুটিতে ঈদের সময়ের চেয়েও বেশি যাত্রী পাচ্ছেন তাঁরা। ঢাকা-সিলেট রুটে বাসের সংখ্যা বেশি থাকলেও কুমিল্লাসহ অন্যান্য জেলার রুটে সীমিতসংখ্যক বাস চলাচল করছে। ঢাকা-সিলেট রুটে রাতের বাসগুলোতে কোনো আসন খালি নেই বলেও জানান তিনি। তবে নির্ধারিত ভাড়াতেই টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে বলে দাবি করেন এই পরিবহন টিকেপ বিক্রেতা। পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রশাসনের উদ্যোগ পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে প্রশাসনও। সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেলুর রহমান বলেন, পর্যটকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পারেন, সে জন্য মহাসড়ক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পূজার ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো প্রাণ ফিরে পেলেও আবাসন সংকট, পরিবহন ভাড়া ও বাড়তি খরচ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে অনেকের মধ্যে। পর্যটন খাতের এই বাড়তি চাহিদার সময়ে সেবার মান বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধ করা গেলে পর্যটকদের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যটন ব্যবসাও আরও ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে পারে।