কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দল নতুন কোনো জোট গঠন না করে ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে একসঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলগুলো নিজ নিজ সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক পরিচয় ও বিদ্যমান জোটের অবস্থান বজায় রেখেই এই প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এ ঐক্যপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী ও মুরুব্বির ভূমিকা পালন করছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর খিলগাঁওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া মাখযানুল উলুম মাদ্রাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া বৈঠক চলে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত। এতে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা, অভিন্ন ব্যানারে যৌথ কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হয়।
ঐক্যপ্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে নতুন কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট গঠন করা হবে না। বরং এই নামটি অভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানার হিসেবে ব্যবহার করে দলগুলো যৌথ কর্মসূচি পালন করবে। তবে প্রত্যেক দল নিজেদের আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখবে।
বিএনপি-জামায়াতের জোটে থাকা দলও থাকবে
সাত দলের এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বর্তমানে বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুক্ত দলগুলোও নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে অভিন্ন ব্যানারে কাজ করতে পারবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন জানান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক হিসেবে সক্রিয় থাকবে। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেও ‘সমমনা ইসলামী দল’ প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে।
আতাউল্লাহ আমিন বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং ইসলামবিরোধী তৎপরতার বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান থেকে কাজ করার লক্ষ্যেই দলগুলো একত্র হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এই ব্যানারে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মুহিউদ্দিন রাব্বানী জানান, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে চলমান সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই সাতটি দল অভিন্ন ব্যানারে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে তাঁর ভাষায়, এটি হেফাজতের নেতৃত্বে গঠিত কোনো রাজনৈতিক জোট নয়। হেফাজত এখানে মুরুব্বির ভূমিকা পালন করছে।
লিয়াজোঁ কমিটিতে ২১ নেতা
সাতটি দলের প্রতিটি থেকে তিনজন করে মোট ২১ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়, পারস্পরিক আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণে কাজ করবে।
বৈঠকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান ও নায়েবে আমির আবদুল আউয়াল এবং আইয়ুব বাবুনগরী উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব, মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বাহাউদ্দীন জাকারিয়া।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন ও আহমদ আলী কাসেমি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইজহার এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদীও বৈঠকে অংশ নেন।
এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল কাদির ও মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসেন রাজীসহ সাত দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ঐক্যপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং অভিন্ন ব্যানারে কর্মসূচি পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা হবে।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ঐক্যের উদ্যোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে কওমি ঘরানার দলগুলোর মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ জোরালো হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এসব দলের কোনো কোনোটি বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে অভিন্ন ব্যানারে সমন্বিতভাবে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
একটি ইসলামী দলের প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হককে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বের করে আনার চাপও এই ঐক্যপ্রক্রিয়ার পেছনে ছিল। তাঁর দাবি, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগেই এ নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছিল। তবে মামুনুল হকের অনড় অবস্থানের কারণে দলটিকে ওই জোট থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। ফলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেই ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে যুক্ত হয়েছে।
নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দলগুলো অভিন্ন বিষয়ে যৌথ কর্মসূচি পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা ইসলামী দলগুলোকেও বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালানো হবে।