৫৯২ কোটি টাকায় তিতাসে দুই কূপ খনন, বাড়তে পারে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
৫৯২ কোটি টাকায় তিতাসে দুই কূপ খনন, বাড়তে পারে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
ছবি: সংগৃহীত

দেশের বৃহত্তম গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্র তিতাসে নতুন দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খননে ৫৯২ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামের কূপ দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হতে পারে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পেট্রোবাংলার অধীন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে নেওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা কমানো।

বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় সভাপতিত্ব করবেন কমিটির চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) এ তথ্য জানান।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং বিজিএফসিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৩২ কোটি টাকা। তবে ২০২৬ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত ব্যয় ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, নতুন দুটি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। গ্যাসের পাশাপাশি কূপ দুটি থেকে কনডেনসেটও পাওয়া যাবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের প্রত্যাশা রয়েছে।

আব্দুল মান্নান বলেন, নতুন কূপ দুটির গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে। সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আরও গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপ থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে।

বিজিএফসিএলের বর্তমান উৎপাদনস্থলের মূল্য বা ওয়েলহেড প্রাইস বিবেচনায় উৎপাদিত গ্যাস ও কনডেনসেটের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং কনডেনসেটের মূল্য ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম বিবেচনায় নিলে একই সময়ে উৎপাদিত গ্যাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

বিজিএফসিএলের বর্তমানে ছয়টি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে কোম্পানিটি।

দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র তিতাসে এ পর্যন্ত ২৮টি কূপ খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। নতুন দুটি কূপ চালু হলে এই ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের সরকারি পরিকল্পনার আওতায় তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপ দুটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটি নেওয়ার ক্ষেত্রে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বিজিএফসিএল চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (সিএনপিসি) প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে নিয়োগ দিয়েছিল।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ১৬টি নতুন কূপ এবং সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে। ওই জরিপের তথ্য ও সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিদেশি ঠিকাদারে খনন, বসবে গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন

প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে দুটি কূপ খনন করা হবে। এ ছাড়া দেশি ও বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ, গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ করা হবে।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) ২০২৬ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানি কমানো সম্ভব হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং শিল্পোন্নয়নে সহায়তা মিলতে পারে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে