হতদরিদ্র মানুষের নিজ ভিটায় সোলারসহ ঘর নির্মার্ণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
হতদরিদ্র মানুষের নিজ ভিটায় সোলারসহ ঘর নির্মার্ণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে

২১অক্টোবর ২০২৬ইং ‘কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে হতদরিদ্র মানুষের নিজস্ব ভিটায় সোলার বিদ্যুৎসহ ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবেলায় হাওর ও উত্তরাঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও আগাম সতর্কসংকেতের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত সহজ করতে বিনা মূল্যে বাইসাইকেল দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।’ বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের বৈদ্যেরবাজার হরিসভা সংস্কৃত কলেজ সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী উপলক্ষে হরিজন, রবিদাস ও বেদে সম্প্রদায়ের নারীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব পরিকল্পনার কথা জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু।জনপ্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে রাজারহাট উপজেলা প্রশাসন এ শাড়ি বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মন্ত্রী বলেন, ‘আগে আবাসন প্রকল্পের ঘর অনেক সময় মানুষের নিজস্ব সমাজ থেকে দূরে নির্মাণ করা হতো। ফলে সেখানে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ কর্মসংস্থান ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। এ অভিজ্ঞতা থেকে চিন্তা করেছি, হতদরিদ্র মানুষের যে দুই থেকে ১০ শতক জমি রয়েছে, সেখানেই তাদের ঘর করে দেওয়া যায় কি না। ঘরে সোলারের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে বিদ্যুতের লোডশেডিং ও অতিরিক্ত বিলের চাপ থেকে তারা মুক্ত থাকতে পারেন।’তিনি বলেন, ‘কুড়িগ্রামের একটি উপজেলাকে এই প্রকল্পের পাইলট এলাকা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।’ দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি তুলে ধরে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এমন কোনো মাস নেই, যখন কোনো না কোনো ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা থাকে না। কখনো ঘূর্ণিঝড়, কখনো বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ধস মোকাবেলা করতে হয়। এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে আয়োজনের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দেখতে হয়। বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বজ্রপাত এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ কারণে হাওর ও উত্তরাঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সাইরেন ও আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যেতে পারেন।’ মন্ত্রী আরও বলেন, কুড়িগ্রামে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানেও বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বজ্রপাতে হতাহতদের অসহায় পরিবারের জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সমস্যা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, যানবাহনের অভাবে অনেক ছেলে-মেয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারে না। আবার পথে ইভ টিজিংয়ের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না। ফলে অল্প বয়সেই অনেক মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘চরাঞ্চলের যেসব শিক্ষার্থী যানবাহনের অভাবে স্কুলে যেতে পারে না, তাদের বাইসাইকেল দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে মেয়েরা যেন নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারে এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে দূরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’বৈদ্যেরবাজার হরিসভা সংস্কৃত কলেজের শিক্ষকদের বেতন-ভাতার বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের মাসিক বেতন-ভাতা মাত্র ১৪৯ টাকা-এমন তথ্য শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। কী কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করে দেখবেন। এরপর বেতন-ভাতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানান তিনি। রংপুর বিভাগের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে মন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলে কৃষিপণ্য উৎপাদন বেশি হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্পায়নের সুযোগ সীমিত। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য সংযোজন হচ্ছে না এবং কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। তিনি বলেন, ‘রংপুর বিভাগের যাঁরা কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তুলবেন, তাঁদের মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলে উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হবে, শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।’যুবসমাজকে মাদক ও জুয়া থেকে দূরে রাখতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরি হলে তারা সুস্থ ধারার জীবনযাপনে উৎসাহিত হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও কুড়িগ্রামের যুবকদের মধ্যে আগ্রহ ও আবেদন কম। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। দুর্গাপূজার আয়োজন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রসঙ্গে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, এবারের দুর্গাপূজা উপলক্ষে সারা দেশে ১৫ হাজার মেট্রিক টন জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এ বছর দেশে প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি। পূজার ছুটিও বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি-এটি আমাদের জন্য ইতিবাচক দিক।’মন্ত্রী আরও বলেন, তারেক রহমানের প্রত্যাশিত মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে বিদেশে নানা অপব্যাখ্যা দেওয়া হলেও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে হবে।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ, পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি পিপিএম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানজিলা তাসনিম, রাজারহাট থানার অফিসার ইনচার্জ মামুনুর রশিদ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা এবং সদস্যসচিব ও জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম, সদস্যসচিব সাহিদুল ইসলাম, প্রেসক্লাব রাজারহাটের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, সাধারণ সম্পাদক প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত, উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক নিতাই চন্দ্র রায়, সদস্যসচিব রতন রায়সহ সংস্কৃত কলেজ মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্যরা। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং হরিজন, রবিদাস ও মালি সম্প্রদায়ের নারীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে