চিলাহাটি স্থলবন্দরে নেই যাত্রীদের আনাগোনা, নেই পণ্যবাহী ট্রেনের শব্দ

এফএনএস (ওবায়দুল ইসলাম; সৈয়দপুর, নীলফামারী) : | প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
চিলাহাটি স্থলবন্দরে নেই যাত্রীদের আনাগোনা, নেই পণ্যবাহী ট্রেনের শব্দ

প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন আইকনিক টার্মিনাল ভবন, চকচকে রেললাইন, আধুনিক কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন শেড সবই রয়েছে। নেই শুধু কর্মচাঞ্চল্য। যাত্রীদের আনাগোনা নেই, নেই পণ্যবাহী ট্রেনের শব্দ কিংবা ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা। নীলফামারীর চিলাহাটি সীমান্তে নির্মিত আধুনিক স্থলবন্দর ও আন্তর্জাতিক রেল অবকাঠামো এখন অনেকটাই নীরব। পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে এসব স্থাপনা। এতে একদিকে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ কাজে আসছে না, অন্যদিকে সম্ভাবনাময় উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২০ সালে পুনরায় চালু হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এই রুটকে কেন্দ্র করে পণ্য পরিবহন, যাত্রী চলাচল এবং সীমান্তবাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে চিলাহাটিতে গড়ে তোলা হয় আধুনিক রেল অবকাঠামো, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সুবিধাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় থমকে যায় কার্যক্রম। বর্তমানে নির্মিত অবকাঠামোর বড় অংশ অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। ফলে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

চিলাহাটি রেলপথে ব্রডগেজের মূল লাইন, লুপ লাইন ও ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রেল অবকাঠামো ও ইয়ার্ড নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত আন্তদেশীয় পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল না থাকায় এসব অবকাঠামোর কার্যকারিতা হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রেললাইনের আশপাশে আগাছা জন্মেছে, বিভিন্ন স্থাপনায় জমেছে ধুলাবালি। যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মূল্যবান অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। কাস্টমস-ইমিগ্রেশন ভবনেও নেই কর্মচাঞ্চল্য। আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল ও পণ্য পরিবহনের কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে চিলাহাটিতে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সুবিধা। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন আইকনিক টার্মিনাল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এসব অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ভবন ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া যাত্রী চলাচল ও পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে নির্মিত ওভারব্রিজ এবং সংযোগ সড়কও প্রত্যাশিত কাজে আসছে না। রাজস্ব হারাচ্ছে রেলওয়ে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সাল থেকে ভারত থেকে মূলত পাথরবাহী ট্রেন বাংলাদেশে আসত। মাসে চার থেকে পাঁচটি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করত। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতে পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি কমে যায়। পরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। একই বছরের জুলাই-আগস্টের পর যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।

স্টেশন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাথরবাহী ট্রেনের প্রতিটি চালান থেকে পাথরের পরিমাণভেদে রেলওয়ে ভাড়া বাবদ ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা আয় করত। মাসে এ আয় দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা। ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ খাতের আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে। চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে স্টেশনের আয় ছিল প্রায় ৬০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকায়। এতে দুই বছরের ব্যবধানে স্টেশনের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। অন্যদিকে, চিলাহাটি বন্দরকে কেন্দ্র করে নীলফামারী, সৈয়দপুর ও আশপাশের এলাকার পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ীরা ব্যক্তিগত পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন। কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বন্দরকেন্দ্রিক নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও এখন বাধাগ্রস্ত।

স্থানীয়দের মতে, চিলাহাটি স্থলবন্দর ও আন্তর্জাতিক রেলপথ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা গেলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতো। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি নেপালসহ আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও বাড়তে পারত। এতে পণ্য পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি, পর্যটন ও সেবাখাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতো। তাঁরা বলেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকলে একসময় সেগুলোর কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

চিলাহাটি স্থলবন্দরের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক জানান, স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণসহ কিছু বিষয় থাকলেও বন্দর ও আন্তর্জাতিক রেলপথ পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত স্থানীয় পর্যায় থেকে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুই দেশের কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সীমান্তবাণিজ্য পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি অর্থে নির্মিত মূল্যবান অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে না রেখে দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগে চিলাহাটি রেলপথ ও বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রম আবারও সচল হবে। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নতুন করে উন্মোচিত হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে