বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজে গোপনীয় প্রাক্কলিত দর ফাঁস, ঠিকাদারদের মধ্যে সিন্ডিকেট করে কাজ ভাগাভাগি এবং এর ফলে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর মতিঝিলে এনসিটিবির কার্যালয়ে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম এ অভিযান পরিচালনা করে।
দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. তানজির আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এনসিটিবি থেকে প্রাথমিক প্রাক্কলনের কপি, দাফতরিক মূল্যতালিকা, ৪২৩তম বোর্ডসভার কার্যবিবরণীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও কিছু রেকর্ডপত্রও সংগ্রহ করেছে অভিযানকারী দল।
দুদক জানিয়েছে, সংগৃহীত নথি ও রেকর্ডপত্র বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের এই অভিযান এমন সময়ে হলো, যখন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের বই ছাপানোর দরপত্রে প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস, পরে সেই মূল্য বাড়ানো এবং ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
এনসিটিবির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানোর জন্য গত জুনের শুরু থেকে পর্যায়ক্রমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২ জুন প্রাক-প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ের দরপত্র প্রকাশ করা হয়। ৩ জুন প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র প্রকাশ হয়। এরপর ৭ জুন ষষ্ঠ শ্রেণি এবং ৯ জুন সপ্তম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র প্রকাশ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিকাদারদের একটি অংশ এনসিটিবির নির্ধারিত প্রাক্কলিত দর আগেই জেনে যায়। পরে ওই দর বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুদ্রণশিল্পের ৭৫ জন মালিক প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর আবেদন করেন।
এনসিটিবির ৪২৩তম বোর্ডসভার কার্যবিবরণীতে ওই আবেদনের পর প্রাক্কলিত দর পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বিনামূল্যের বই ছাপানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বই ২২ কোটির বেশি। বাকি বই প্রাথমিক স্তরের। সব মিলিয়ে বই ছাপানোর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
এবারের বই ছাপানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারীর সময়ে। শুরুতে বাজার যাচাই করে প্রাথমিক স্তরের বইয়ের জন্য প্রতি ফর্মা কাগজের দাফতরিক প্রাক্কলিত গড় দর ধরা হয়েছিল ৩ টাকা ২৬ পয়সা। মাধ্যমিক স্তরের জন্য এই দর ছিল ২ টাকা ৮৫ পয়সা।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সংস্থার কমিটির মাধ্যমে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করা হয়। কোনো ঠিকাদার প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি দর দিলে তিনি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েন। ফলে দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের কাছে প্রাক্কলিত দর আগে থেকে জানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর প্রতি ফর্মার গড় কার্যাদেশের দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরে প্রতি ফর্মায় দর বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতে কাগজের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৫ লাখ রিম। এক রিমে এক হাজার ফর্মা হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। এই হিসাবে কাগজের প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর কারণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ২৫০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাথমিক স্তরেও দর কিছুটা বেড়েছে। ২০২৬ সালে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের প্রতি ফর্মার গড় কার্যাদেশের দর ছিল ৩ টাকা ৪৪ পয়সা। ২০২৭ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ টাকা ৫৪ পয়সা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, মূলত মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর ক্ষেত্রেই বাড়তি অর্থ ব্যয়ের কৌশল করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রাক্কলিত দর জানার পর ঠিকাদাররা তা কিছুটা কম-বেশি করে দরপত্রে অংশ নেন এবং পরে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি করেন। এর ফলে শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতেই প্রায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দুদকের অভিযান ও নথি সংগ্রহের পর এখন এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। সংগৃহীত নথিপত্রের পর্যালোচনার পর কমিশনে দেওয়া প্রতিবেদনে অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।