বর্তমানে দেশের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে সর্বোচ্চ ধান-চালের মজুত রয়েছে। গুদামগুলোতে বাড়তি মজুতের জায়গা নেই। তাছাড়া ধান-চাল সংগ্রহের জন্য পাটের বস্তারও রয়েছে ব্যাপক সঙ্কট। কিন্তু তারপরও সরকার মিলারদের থেকে আরো দুই লাখ টন চাল কিনতে যাচ্ছে। তাতে মিলাররা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ কৃষক। ইতিমধ্যে ডিলাররা চাল সরবরাহের অনুমোদন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। অভিযোগ উঠেছে, মিল মালিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের জোরালো চাপে ওই বাড়তি চাল কিনছে সরকার। খাদ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের মূল মৌসুমে যে মিল এক হাজার টন চাল দিতেও ব্যর্থ হয়েছে। আর ওই মিলের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতাও মাত্র ৬ টন ছিলো। এখন ওই মিল মালিকই ৫ হাজার টন চাল বরাদ্দের এমপির ডিও লেটার নিয়ে এসেছে। যদিও এবার বোরো মৌসুমের ধান ও চাল সংগ্রহ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় দেশের সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে সরকারের কাছে ধান ও চালের ২০ লাখ ২৩ হাজার ২৯৩ টন মজুত দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যে গম ও আতপ চালসহ মোট খাদ্যশস্যের বর্তমান মজুত ২৩ লাখ ৩৯ হাজার টন। যা অন্য যে কোনো বছরের একই সময়ের সর্বোচ্চ। তাছাড়া দীর্ঘ কয়েক বছর পরে এবারই সরকার বোরো মৌসুমে এতো পরিমাণে ধান-চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে।
সূত্র জানায়, বিদ্যমান সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের নীতিমালা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান এবং মিলারদের কাছ থেকে প্রক্রিয়াজাত চাল কেনা হয়। কিন্তু সরকারের শুধু চাল সংগ্রহের নতুন সিদ্ধান্তে পুরো সুফল পাবে বাণিজ্যিক মিলাররা। সরকারের ওই সিদ্ধান্তের পেছনে মিল মালিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের জোরালো চাপের অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন করে চাল সরবরাহের বরাদ্দ পেতে খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক তদবির চলছে। সারাদেশ থেকে এরই মধ্যে সারাদেশ প্রায় সাড়ে ৮শ মিল মালিকের আবেদন জমা পড়েছে। আর চালের বরাদ্দ পেতে দেড় শতাধিক মিল মালিক নিজ নিজ এলাকার জাতীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) জমা দিয়েছে। শুধু চিঠি দিয়েই অনেকে ক্ষান্ত হননি। তাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক মহল থেকে ধারাবাহিকভাবে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমে মোট ১৮ লাখ ৯৪ হাজার টন ধান ও চাল সংগ্রহ করে। তার মধ্যে ৫ লাখ ৭৮ হাজার টন ধান, ১২ লাখ ১১ হাজার টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ ৫ হাজার টন আতপ চাল রয়েছে। যা প্রাথমিক লক্ষ্যের চেয়েও বেশি। মৌসুমের শুরুতে সরকার ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল। এবার ধানের দাম কম থাকায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর চাল সরকারকে চাল সরবরাহ করে লাভবান হয়েছে মিলাররা। সেজন্যেই নতুন বরাদ্দ পেতেও তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। দেশে উদ্বৃত্ত মজুত থাকার পরও মিল মালিক ও এমপিদের চাপে নতুন করে চাল বরাদ্দ দেয়ার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করছে সরকারের স্বাভাবিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা নীতিকে।
সূত্র আরো জানায়, বাজারে এ বছর ধানের দাম কম থাকায় মিল মালিকররা চাল সরবরাহ করে লাভবান হয়েছে। এবার সরকার সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা দরে ক্রয় করেছে। যা পাইকারি বাজারের চেয়েও বেশি। চাল সরবরাহ করে মিল মালিকরা প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পেয়েছে। কিন্তু বঞ্চিত হয়েছে কৃষকরা। প্রান্তিক কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পায়নি। অথচ মধ্যস্বত্বভোগী মিল মালিকদের স্বার্থরক্ষায় সরকারি খাদ্য নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাতে তৈরি হয়েছে সরকারি অর্থের অপচয় ও সিন্ডিকেট প্রসারের ঝুঁকি। চাল কেনার এই উদ্যোগ শুধু একটি শ্রেণীর স্বার্থ হাসিল করা। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে আমন মৌসুমে ধানের দাম কমে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে সরকারের আমন মৌসুমে ধান সংগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারেন।
এদিকে এ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেন জানান, মিলারদের চাল বরাদ্দের জন্য বিভিন্ন তরফ থেকেই সুপারিশ এসেছে। মন্ত্রণালয় থেকে সেগুলো বরাদ্দের জন্য বলেছে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজার টনের বরাদ্দ তালিকা হয়েছে। এবার ধানের দাম কম ছিলো। সরকারকে চাল সরবরাহ করে মিলাররা লাভবান হয়েছে। সেজন্যেই এবার আগ্রহ বেশি। তবে সরকারও চায় খাদ্যনিরাপত্তা মজুত বাড়াতে।