দেশ কাঁপাচ্ছে নানা ধরনের ভাইরাস জ্বর

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১৭ এএম
দেশ কাঁপাচ্ছে নানা ধরনের ভাইরাস জ্বর

দেশ কাঁপাচ্ছে নানা ধরনের ভাইরাস জ্বর। জ্বরের রোগীতে হাসপাতালে ঠাঁই নেই অবস্থা। কিন্তু দিন দিন রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে ডেঙ্গু, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ বাড়ছেই। গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা শিশু হাসপাতালে গড়ে ২৫০ থেকে ২৭০ জন রোগী এলেও সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৪৫০ থেকে ৪৬০ দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বড় ধরনের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে জ্বরাক্রান্ত রোগীর মাত্র ৫ শতাংশ ভর্তি রয়েছে। সেপ্টেম্বরের পর সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা থাকলেও ডেঙ্গু, হাম ও অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণ একসঙ্গে চলায় সামগ্রিক জ্বরের চাপ দ্রুত কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। পরিস্থিতি এমন যে, বর্তমানে জ্বরকে আর সাধারণ জ্বর ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ একই জ্বরের আড়ালে থাকতে পারে তিন ভাইরাস কিংবা আরো একাধিক সংক্রমণ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে মানষের দেহে একই সময়ে একাধিক ভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। ডেঙ্গু, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চিকুনগুনিয়া, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের প্রভাবে চারদিকে দেখা দিচ্ছে জ্বর। এ অবস্থায় জ্বরকে আর সাধারণ উপসর্গ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও আগে থেকে অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। এখন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে একই উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর শরীরে একাধিক ভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। ফলে রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসককে দিতে হচ্ছে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তাতে রোগী ও স্বজনদের আর্থিক চাপ বাড়ছে। আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল হাতে না আসা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দেয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক শিশু রোগী আসছে। বেশির ভাগ শিশুই জ্বর, শরীরে র‌্যাশ ও ডায়রিয়া নিয়ে আসছে। অনেকের পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে না, কিন্তু ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। প্রায় ৫ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, চলতি বছর দেশে ইতিমধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষে ঠেকেছে আর শতাধিক মৃত্যু ঘটেছে। ডেঙ্গু সব বয়সী মানুষের হতে পারে। ওই জ্বরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তীব্র শরীরব্যথা। মেরুদন্ড ও চোখের পেছনেও ব্যথা হতে পারে। ডেঙ্গুতে জ্বরে শরীরে র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করা জরুরি। ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো রক্তক্ষরণ ও শকের ঝুঁকি। তাছাড়া তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বারবার বমি, রক্তপাত কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। ডেঙ্গুতে জ্বর চলাকালে র‌্যাশ দেখা দিতে পারে আর হামের ক্ষেত্রে সাধারণত জ্বরের পর র‌্যাশ শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। হাম শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও তা কোনোভাবেই হালকা রোগ নয়। কারণ নিউমোনিয়া এর অন্যতম গুরুতর জটিলতা হতে পারে। আর ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেঙ্গু বা হামের তুলনায় উপসর্গে আলাদা হলেও জ্বর থাকায় রোগীরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও নাক বন্ধ হয়ে থাকা বেশি দেখা যায়। সাধারণত ডেঙ্গুর মতো তীব্র শরীরব্যথা বা হামের মতো র‌্যাশ থাকে না। কিন্তু শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ফ্লু নিউমোনিয়াসহ গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা থাকে। ইনফ্লুয়েঞ্জা হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে। বর্তমানে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া রোগীও মিলছে। ফলে অনেক রোগীর জ্বর কমে গেলেও শরীর ব্যথা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকছে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীরে তীব্র ব্যথা হওয়ায় হাঁটা-চলায় সমস্যা হতে পারে। কারো কারোর চোখমুখ ফুলে যায়। 

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশের গ্রামাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গুর ডেন-২ ভাইরাসের প্রকোপ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ডেন-৩ এবং মিশ্র ডেঙ্গু সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে এ বছর আরএসভির প্রকোপও অস্বাভাবিক বেশি দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গু সব বয়সী মানুষের হতে পারে। হাম মূলত ছোটদের বেশি দেখা গেলেও দুটি রোগই শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। তাতে রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর হাসপাতালে এলে চিকিৎসার সুযোগও সংকুচিত হয়ে যায়। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষার ভিত্তিতে চিকিৎসককে রোগের কারণ নির্ধারণ করা জরুরি। জ্বর হলে সাধারণত পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার এবং বয়স ও ওজন অনুযায়ী ওআরএস দিতে হবে। তীব্র পেটব্যথা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বারবার বমি, পানি বা খাবার গ্রহণে অক্ষমতা, র‌্যাশ কিংবা শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী জানান, দেশে সাধারণত মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। এ বছর মার্চ-এপ্রিলের পর সংক্রমণ কিছুটা কমলেও পরে আবার বেড়েছে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে ছড়াচ্ছে। তার মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা এখন প্রধান। ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ও টাইপ-বি দুটিই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শনাক্ত হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে গণপরিবহন, স্কুল-কলেজ ও জনসমাগমের স্থানে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাস ছড়াচ্ছে। তাছাড়া দেশে হামের সংক্রমণও অব্যাহত রয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে