বিশ্বমঞ্চে প্রথম ভাষণ, ব্যস্ত কর্মসূচি নিয়ে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাসস | প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:১২ পিএম
বিশ্বমঞ্চে প্রথম ভাষণ, ব্যস্ত কর্মসূচি নিয়ে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ছবি: সংগ্রহীত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ইস্তাম্বুলে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি শেষে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে তাঁর প্রথম ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।

বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে তাঁকে নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী সেখানেই অবস্থান করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নিউইয়র্কে বিএনপি নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিমানবন্দর ও হোটেল এলাকায় জড়ো হন। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, মিশিগান ও জর্জিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকেও নেতাকর্মীরা আসেন। তাঁদের হাতে ছিল ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন। বিভিন্ন স্লোগানে বিমানবন্দর ও হোটেল এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। হোটেলে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।

বিমানবন্দরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ব্যানারে তারেক রহমান ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার কথাও দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ছাড়াও রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, শামা ওবায়েদ এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

নিউইয়র্ক সফরের মূল আকর্ষণ ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। নিউইয়র্ক সময় বিকেল আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিটে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় পরিবর্তন হতে পারে এবং ভাষণের জন্য ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দ রয়েছে।

ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের জন্য স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন তিনি। এরপর ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেবেন।

এদিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ার ফিলস-আইমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে তাঁর।

এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক এবং মেটা প্ল্যাটফর্মসের প্রধান বৈশ্বিক বিষয়াবলি কর্মকর্তা জোয়েল কাপলানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

২৩ সেপ্টেম্বর সকালে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাওয়ার কথা রয়েছে।

একইদিন ‘জলবায়ু পদক্ষেপ এবং ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন তিনি। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক সভাতেও তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

২৩ সেপ্টেম্বর ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। একইদিন বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে।

এদিন মাতৃ ও নবজাতকের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রোধ সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানেও প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।

২৪ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গেও বৈঠকের কথা রয়েছে তাঁর। রাতে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে নৈশভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

সফরের শেষ দিন ২৫ সেপ্টেম্বরও ব্যস্ত কর্মসূচি রয়েছে। এদিন জেপিমরগান হেডকোয়ার্টার্সে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে।

২৫ সেপ্টেম্বর কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রিন্স জাইদ আল হুসেইনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

সফরকালে আরও কয়েকটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এসব আলোচনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় উঠে আসবে।

২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটাই প্রথম অংশগ্রহণ। তাঁর বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তাঁর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার বিষয়টিও এই সফরকে আলাদা তাৎপর্য দিচ্ছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে