বন্দিশালার জায়গায় হতে যাচ্ছে মুক্তির পরিসর

সিলেটের কারাগারের জমিতে পার্ক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত

এফএনএস (এইচ এম শহীদুল ইসলাম; সিলেট) : | প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
সিলেটের কারাগারের জমিতে পার্ক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত

সিলেটের পুরোনো কারাগারের গল্প এবার বদলাতে যাচ্ছে। বন্দিত্বের জায়গা থেকে জন্ম নিতে যাচ্ছে উন্মুক্ততার এক নতুন গল্প। যেখানে দেয়ালের বদলে থাকবে সবুজ, আর অতীতের স্মৃতি পথ দেখাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। একসময় যেখানে ছিল বন্দিত্ব, সেখানে এবার তৈরি হবে মুক্তির পরিসর। যে উঁচু দেয়াল বছরের পর বছর নগরবাসীর চোখের আড়ালে রেখেছে বিশাল একটি নগরভূমি, সেই দেয়াল সরিয়ে সেখানে গড়ে উঠবে সবুজে ঘেরা নান্দনিক পার্ক। আর সেই পার্কের এক পাশে দাঁড়াবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের স্মারক-রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সিলেট নগরীর পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের জায়গাটিকে ঘিরে এমনই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় কারাগারের জমি সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি, সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, কারা মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামালসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দেয়ালের ওপাশের জায়গা এবার সবার

সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে ছিল কারাগারের সীমানায় বন্দি। বাইরে থেকে দেখা যেত শুধু উঁচু দেয়াল। ভেতরে পড়ে থাকা বিশাল জায়গাটি ছিল নাগরিক জীবনের নাগালের বাইরে। এবার সেই চিত্র বদলানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারাগারের জায়গাজুড়ে থাকবে সবুজ। থাকবে হাঁটার পথ, উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিকদের অবসর কাটানোর সুযোগ। শিশুরা খেলবে, প্রবীণরা হাঁটবেন, পরিবার নিয়ে মানুষ সময় কাটাবেন। ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরে তৈরি হবে স্বস্তির একটি নতুন ঠিকানা।

নগরবাসীর দীর্ঘদিনের চাহিদা ছিল এমন একটি উন্মুক্ত সবুজ পরিসরের। সেই প্রত্যাশাই এবার বাস্তব রূপ পাওয়ার পথে।


কারাগারের জায়গায় ইতিহাসের পাঠশালা

শুধু পার্ক নয়, এই জায়গার একটি অংশে নির্মাণ করা হবে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ফলে স্থানটি কেবল বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হবে না। এখানে একই সঙ্গে সংরক্ষিত হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতি। নতুন প্রজন্ম পার্কে সময় কাটানোর পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।

একদিকে থাকবে প্রকৃতির সান্নিধ্য, অন্যদিকে থাকবে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ। নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি পেতে যাচ্ছে এমনই একটি দ্বৈত পরিচয়।

প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে পুরোনো কারাগারের জায়গায় পার্ক নির্মাণ স্থানীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম অংশ ছিল। সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও বিভিন্ন সময়ে নগরবাসীর জন্য এই জায়গা উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলেছেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি ও আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে আধা-সরকারি (ডিও) পত্র দেন।

এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটি সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা শেষে জমিটি সিসিকের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেয়। বৃহস্পতিবারের সভায় সেই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা শেষে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

থাকবে না কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা

পুরোনো কারাগারের জমি সিসিকের কাছে হস্তান্তর হলেও সেখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা বা কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যাবে না।

অর্থাৎ, নগরীর এই মূল্যবান জমির ব্যবহার হবে জনস্বার্থে। পার্ক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বাইরে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে না। এদিকে পুরোনো কারাগারের বন্দিদের বাদাঘাটে অবস্থিত কারাগারে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে ‘সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২’ নামে আরেকটি কারাগার নির্মাণ করা হবে।

বদলে যাবে একটি জায়গার পরিচয়

একটি সময় এই জায়গার পরিচয় ছিল-কারাগার। উঁচু দেয়াল, প্রবেশে বিধিনিষেধ আর বন্দিত্বের বাস্তবতা ছিল এর সঙ্গে জড়িয়ে। সেই জায়গাতেই এবার হাঁটবে মানুষ। যেখানে এতদিন ছিল বন্দিত্বের প্রতীক, সেখানে থাকবে সবুজ। যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ছিল সীমিত, সেখানে তৈরি হবে উন্মুক্ত নাগরিক পরিসর। যেখানে ছিল নীরবতা, সেখানে শিশুদের হাসি ও মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে জায়গাটি। আর সেই সবুজের মাঝেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মনে করিয়ে দেবে। স্বাধীনতার পথ কখনো সহজ ছিল না। সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন, অচিরেই পার্ক ও জাদুঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। বন্দিদের স্থানান্তরের পর পর্যায়ক্রমে পুরো জায়গাটিকে পার্কে রূপ দেওয়া হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে