কুড়িগ্রামের উলিপুরে জমি আত্মসাৎ, জালিয়াতির মাধ্যমে বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও সরকারি মালামাল লোপাটের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের কল্যাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়টি ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালে দক্ষিণ দলদলিয়া মৌজার বাসিন্দা আব্দুর রহিম তার ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে উলিপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ৮৬ শতাংশ জমি হেবা দলিল করে দেন। দলিল নং- ৩২৫, তারিখ: ৭ জানুয়ারি ১৯৯১। মৌজা: দক্ষিণ দলদলিয়া, জে এল নং- ৮৩, সাবেক খতিয়ান- ১৭৫১, হাল দাগ- ২৭৫২। দলিলের মাত্র ২৩ দিন পর ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিককে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক করে কৌশলে একই দাগ খতিয়ানের ৩৩ শতাংশ জমি তিনি বিদ্যালয়ের নামে (মহাপরিচালক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর) দলিল করে দেন। এরপর ১৯৯৬ সালের ৪ জুন একই দাগ-খতিয়ানের আরও ২৩ শতাংশ জমি বিদ্যালয়ের নামে দানপত্র দলিল করে দেন। দলিল নং- ৩৮৬। দুই দফায় মোট ৫৬ শতাংশ জমি টাকার বিনিময়ে বিদ্যালয়ের নামে দান করা হয়।
প্রধান শিক্ষক কৌশলে স্কুলের দখলে মাত্র ৩০ শতাংশ জমি বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে ঘিরে নেন এবং বাকি ২৬ শতাংশ জমি নিজে ভোগদখল করছেন। এমনকি তিনি ভূমি জরিপের সময় ৮৬ শতাংশ জমিই নিজের নামে রেকর্ড করে নেন। এদিকে জাতীয়করণের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বৈধ কাগজপত্র চাইলে প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করেন এবং তার ভিত্তিতেই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়। প্রায় তিন যুগ পর বিষয়টি প্রকাশ হলে এলাকাজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
শুধু জমি নয়, সাবেক প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আ.ন.ম বজলুর রশিদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। আত্মসাৎকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে- একটি স্টিলের আলমারি, একটি ল্যাপটপ, একটি প্রজেক্টর মেশিন, একটি নলকূপ, একটি পানির ট্যাংকি, একটি বিদ্যুৎ চালিত মোটর পাম্প, একটি টিনের চালা, একটি সাউন্ড বক্স ও ক্ষুদে চিকিৎসকের পোশাক। এসব ঘটনায় এলাকাবাসী গত ১৮ মে/২৬ ইং সাবেক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগের এক মাস পর গত ১৮ জুন/২৬ ইং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদী হাসান সরেজমিনে তদন্ত করেন। কিন্তু তদন্তের আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মহসিনা আক্তার বলেন, “বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে আমরা তিনজন সহকারী শিক্ষক জমি ক্রয়ের জন্য প্রধান শিক্ষককে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ৭৫ হাজার টাকা দিয়েছি।” ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আ.ন.ম বজলুর রশিদ বলেন, “আমার বিরুদ্ধে স্কুলের মালামাল আত্মসাতের ঘটনা মিথ্যা। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর মালামালের ঘাটতি পেয়েছি। তদন্তকালে তা লিখিতভাবে জমা দিয়েছি।” অভিযোগের বিষয়ে সাবেক প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক অনেকটাই সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “স্কুলের নলকূপটি হারিয়ে গেছে। ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর আমার বাড়িতে আছে। আমার বাবা স্কুলের নামে যে ৫৬ শতাংশ জমি দিয়েছেন, তার আগেই পুরো জমি আমার নামে দলিল করে দিয়েছেন। আমার বাবা মারা গেছেন। কর্তৃপক্ষ চাইলে আমি স্কুলের নামে ৩৩ শতাংশ জমি দলিল করে দেব।”
উপজেলা শিক্ষা অফিসার নার্গিস ফাতেমা তোকদার বলেন, “তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.টি.এম আরিফ এর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন আমার কাছে জমা দিলে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রেরণ করেছি।” এলাকাবাসী অবিলম্বে আত্মসাৎকৃত ৫৬ শতাংশ জমি উদ্ধার করে বিদ্যালয়ের নামে ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি মালামাল আত্মসাতের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।