গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল

এফএনএস | প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৬ পিএম
গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট আবারও প্রমাণ করেছে, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনো একটি নাজুক অবস্থানে রয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি-সব মিলিয়ে সংকটটি এখন কেবল একটি সেবাগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, শিল্প এবং জনজীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থাকছে। এর সঙ্গে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এতে স্পষ্ট, বর্তমান সংকটের একটি অংশ তাৎক্ষণিক কারিগরি সমস্যাজনিত হলেও এর মূল কারণ দীর্ঘদিনের সরবরাহ ঘাটতি ও পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং নতুন অনুসন্ধান ও উত্তোলনের গতি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সময়ে ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং টার্মিনালের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এই নির্ভরতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে কেবল আমদানিনির্ভর নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান হতে পারে না। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বক্তব্যে অতীত সরকারের নীতিকে দায়ী করা হলেও বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো দায় নির্ধারণের পাশাপাশি কার্যকর সমাধান বাস্তবায়ন। জ্বালানি খাতের মতো কৌশলগত বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, স্বচ্ছ পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক নীতিই বেশি প্রয়োজন। জনগণ অতীতের ব্যাখ্যার চেয়ে বর্তমানের কার্যকর উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেখতে চায়। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান, শিল্প ও আবাসিক খাতে সরবরাহের যৌক্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সংকট সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামো আধুনিকীকরণ, জ্বালানি অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর বিকল্প নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো একক সরকারের নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের বিষয়। তাই বর্তমান সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সুপরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল দেশের শিল্প, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।