জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে এখনো ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬৬ জন নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন। ওই কারাগারের নথিপত্র, সার্ভার ও ডাটাবেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব বন্দির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর পুরান ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
কারা মহাপরিদর্শক জানান, নরসিংদী কারাগার থেকে মোট ৮২৬ বন্দি পালিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১৬৬ জনের নাম, ঠিকানা ও মামলাসংক্রান্ত তথ্য বর্তমানে কারা কর্তৃপক্ষের হাতে নেই। কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় সার্ভার, ডাটাবেজসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব তথ্য উদ্ধারের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
পলাতক বন্দিদের মধ্যে ৯ জন জঙ্গিবাদের মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। তাদের ছয়জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো তিনজন পলাতক রয়েছেন। তবে পলাতক বন্দিদের অধিকাংশই জঙ্গি নন। তারা বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন আসামি।
পলাতক বন্দিদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ন্যস্ত রয়েছে জানিয়ে আইজি প্রিজন বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। তবে ১৬৬ বন্দির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য না থাকায় পলাতকদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের সঙ্গে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক জানান, বিষয়টি নিয়ে তারাও উদ্বিগ্ন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে পলাতক বন্দিদের কোনো ধরনের সংযোগ আছে কি না, তা নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
কারাগারে জঙ্গিদের আলাদা করে রাখার বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে সংবাদ সম্মেলনে। এ বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, অতিরিক্ত বন্দির চাপের কারণে আলাদাভাবে রাখার ক্ষেত্রে আবাসন সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই ওয়ার্ড বা ভবনে থাকার কারণে বন্দিরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুতর বন্দিদের পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখে আলাদা জোনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কারাগারের ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি। দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি রয়েছেন। ফলে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে কাজ করতে হচ্ছে।
আইজি প্রিজন জানান, সাধারণত প্রায় ৮০ হাজার বন্দি নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ কাজ করে। বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার ৭৯৬ জন বন্দি কারাগারে প্রবেশ করছেন এবং প্রায় ৩ হাজার জন মুক্তি পাচ্ছেন। নিয়মিত আসা-যাওয়া থাকলেও যে সংখ্যা থেকে যাচ্ছে, সেটিই মোট বন্দির সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি জানান, ১ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ২৬ হাজারের বেশি মোবাইল কোর্টে দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। তাদের অনেককে এক দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন, এক মাস বা তিন মাসের মতো স্বল্পমেয়াদি সাজা দেওয়া হচ্ছে। এতে কারাগারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে।
কারাগারে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের কারারক্ষীদের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারে কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গত এক বছরে বিভিন্ন অভিযানে ৩ হাজারের বেশি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। কোনো তথ্য পাওয়া গেলে বা বিষয়টি শনাক্ত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বন্দিদের চিকিৎসাসেবা নিয়েও সংকটের কথা জানান তিনি। কারাগারে চিকিৎসকের জন্য মোট ১৫১টি পদ থাকলেও বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। অন্যান্য কারাগারে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে চিকিৎসক দেওয়া হচ্ছে। তবে তারা অন্য জায়গায় দায়িত্ব পালন করায় কারাগারে পূর্ণকালীন সময় দিতে পারছেন না। বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে ১০১ জন সিভিল সার্জন চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
কারাগারগুলোতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় সব কারাগারেই ফার্মাসিস্ট অথবা মেডিকেল ও ডিপ্লোমা যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী রয়েছেন। সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশন থেকে ৫৫ জন নার্স নিয়োগের আদেশ হয়েছে। শিগগিরই তারা যোগ দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন কারা মহাপরিদর্শক।
কারা অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি। তার ভাষ্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কারা অধিদপ্তর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। গত দুই বছরে ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত এবং ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো অপরাধের কারণে ৩০৩ জনকে প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন বিভাগের বাইরে পাঠানো হয়েছে।
মাদকসংক্রান্ত অপরাধে কারারক্ষীসহ কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে বলেও জানান আইজি প্রিজন।
কারা ব্যবস্থাপনা আধুনিক করার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। গত ২৪ জুন থেকে ময়মনসিংহ জেলা কারাগারকে ‘ক্যাশলেস’ কারাগার হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে কারাগারে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি কারা প্রশাসনের কার্যক্রম গতিশীল করতে সদর দপ্তর ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসনে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৮৯৯টি নতুন পদ অনুমোদন করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৫০০টি পদের চাহিদা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক, মেধাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় অনিয়ম ও দালালচক্রের সুযোগ কমার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে ভুয়া পরীক্ষার্থী শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
কারা বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকেই প্রধান বিবেচনা করা হবে বলে মন্তব্য করেন কারা মহাপরিদর্শক।
অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমাতে এবং কারাগারের ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কারাগার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দুটি কেন্দ্রীয় কারাগার ও আটটি জেলা কারাগার চালু করা হয়েছে। প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়াতে ঢাকা বিভাগকে পুনর্বিন্যাস করে দুটি বিভাগে বিভক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়েছে। তারা নিজ নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও সরকারের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ধাপে ধাপে তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান আইজি প্রিজন।
বিদেশি বন্দি মারা গেলে তাদের মরদেহ ব্যবস্থাপনার বিষয়েও তথ্য দেন তিনি। গত দুই বছরে প্রায় ১৭ জন বিদেশি বন্দির মরদেহের ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণত তিন মাস পর মরদেহের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট পরিবার বা দেশ থেকে কেউ মরদেহ নিতে না এলে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য শুধু কারাগার পরিচালনা করা নয়। নিরাপত্তার পাশাপাশি বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসন এবং কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত মর্যাদা, দক্ষতা ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক সংশোধনমূলক সেবা গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।