শিক্ষাব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো পরিবার, বিশেষ করে অভিভাবক সমাজ। একজন শিশু বা কিশোর শিক্ষার্থী তার জীবনের সিংহভাগ সময় কাটায় তার নিজের ঘর ও পরিবারের সান্নিধ্যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের ভেতর শিক্ষকের কাছে নয়। তাই একটি সন্তানকে কেবল গতানুগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অভিভাবকের গভীর সচেতনতা, মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া এবং দূরদর্শিতার কোনো বিকল্প নেই। দিন যত গড়াচ্ছে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে শহরাঞ্চলের সচেতন অভিভাবকদের একটি বড় অংশ তাদের সন্তানদের পড়াশোনা ও মানসিক বিকাশ নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গ্রাম কিংবা মফস্বল শহরের চিত্রটি এখনো আশানুরূপ জায়গায় পৌঁছায়নি। মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের বহু অভিভাবক এখনো প্রাচীন ও গতানুগতিক ধারায় সন্তানকে বড় করার চেষ্টা করছেন। আবার সচেতনতার অভাব কিংবা সঠিক উপায়ের অজ্ঞতার কারণে অনেকেই সন্তানকে সঠিক কাউন্সেলিং বা মানসিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এর ফলে একটু সংবেদনশীল বা ভিন্নধর্মী প্রতিভাবান অনেক শিক্ষার্থীই সঠিক পথ থেকে ছিটকে পড়ে বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে।
অভিভাবক যখন প্রকৃত অর্থে সচেতন হয়ে ওঠেন, তখন শিক্ষার্থীর বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা বা ভুল পথে পা বাড়ানোর ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়। একজন সচেতন অভিভাবক কেবল ঘরের কোণায় বসে থাকেন না, তিনি নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ রাখেন, শিক্ষকের কাছ থেকে সন্তানের পড়াশোনার গতিপ্রকৃতি, ক্লাসের আচরণ এবং অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে তার মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। সবচেয়ে বড় কথা, তারা সন্তানের কাছে কেবল শাসনকর্তা বা অভিভাবক হয়ে থাকেন না, বরং হয়ে ওঠেন একজন পরম ও একান্ত বন্ধু। একজন সত্যিকারের বন্ধুর মতো তারা সন্তানের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, কিশোর বয়সের হরমোনজনিত বা মানসিক পরিবর্তন এবং না বলা কথাগুলো সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। এর ফলে শিক্ষার্থী কোনো রকম ভীতি বা জড়তা ছাড়াই এক অনুকূল ও সাবলীল পরিবেশে জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত হয়।
সন্তান মাত্রই ভুল করবে এবং এটিই স্বাভাবিক বিকাশ প্রক্রিয়ার অংশ-এই সত্যটি অভিভাবকদের বুঝতে হবে। অভিভাবক হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা বা শাসন করার অধিকার অবশ্যই আছে, তবে সেই শাসন যেন কোনো অবস্থাতেই শারীরিক বা মানসিক নিপীড়নে রূপ না নেয় এবং সন্তানের মনে দীর্ঘমেয়াদী দুশ্চিন্তা বা ভীতি তৈরি না করে। কোনো একটি বিষয়কে কড়া ভাষায় বা রাগের বশে জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে যদি ভালোবাসা, ধৈর্য এবং যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যায়, তবে তা শিক্ষার্থী মনপ্রাণ দিয়ে ধারণ করতে শিখতে পারে এবং নিজের জীবনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাস্তবায়ন করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
আজকের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক যুগে অনেক অভিভাবকের মাঝেই একটি মারাত্মক ভুল ধারণা কাজ করে; তারা মনে করেন সারাদিন বই-খাতার ভেতর মুখ গুঁজে থাকাই একজন শিক্ষার্থীর একমাত্র কাজ এবং ধর্ম। কিন্তু এই ধারণাটি শুধু ভুলই নয়, বরং আত্মঘাতী। পড়াশোনা জীবনের কেবল একটি অংশমাত্র, পুরো জীবন বা এর সমার্থক নয়। শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার মানসিক চাপ বা পড়ার বোঝা কোনোভাবেই চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের খেলাধুলা, সৃজনশীল চর্চা, আঁকাআঁকি, গান কিংবা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিতে হবে। মানসিক বিকাশ, আনন্দ এবং প্রফুল্লতা ছাড়া কেবল সার্টিফিকেটসর্বস্ব মুখস্থ বিদ্যা মানুষের ভেতর ন্যূনতম মানবিকতা তৈরি করতে পারে না। সবার আগে আমাদের প্রয়োজন একটি সুস্থ, সবল, প্রাণবন্ত এবং মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ। একটি শিশুর মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশের উপযুক্ত ও সহায়ক ক্ষেত্র যদি পরিবার থেকে তৈরি করে না দেওয়া যায়, তবে তা দিনশেষে পুরো সমাজের জন্যই এক বিরাট আত্মঘাতী সংকট তৈরি করবে। সারাদিন পড়ার রুটিনে একটি শিশুকে বন্দি করে রাখার কারণে বহু শিক্ষার্থীরই পড়াশোনা ও জীবন সম্পর্কে এক ধরণের তীব্র বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়, যা পরবর্তীতে তাদের মনে গভীর হতাশা, একাকীত্ব ও বিক্ষুব্ধতার জন্ম দেয়।
পরিবার থেকে পাওয়া বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত একটি শিশু বা কিশোর ধীরে ধীরে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই ধরণের অভিভাবকীয় উদাসীনতা ও অতিরিক্ত চাপের কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া তরুণ প্রজন্মই পরবর্তীতে ভুল সঙ্গের প্রভাবে মাদকের করাল গ্রাসে আসক্ত হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ ও জীবনকে চিরতরে বিপর্যস্ত করে তোলে। বর্তমান সময়ের এই অবক্ষয় রোধ করতে হলে অভিভাবক সমাজকে প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু ভালো রেজাল্ট বা জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ মোহে আচ্ছন্ন না হয়ে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সন্তান কার সাথে মিশছে, তার মনে কোনো কষ্ট বা চাপ জমে আছে কি না, কিংবা সে তার শখের কাজগুলো করার পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে কি না-এসব বিষয় নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে। প্রকৃতির সান্নিধ্য, উন্মুক্ত মাঠে দৌড়ঝাঁপ এবং সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা আজকের দিনে অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
একটি শিশুর শৈশব ও কৈশোরকে খাঁচায় বন্দি করে রেখে কখনো পরিপূর্ণ মানসিকতার মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। আজকের প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে শিশুদের ওপর যে অদৃশ্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা তাদের সৃজনশীলতাকে অংকুরে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। একজন শিশু যখন প্রকৃতির বুক থেকে দূরে কেবল চার দেওয়ালের মাঝে স্ক্রিন বা বইয়ের পাতায় আটকে থাকে, তখন তার ভেতরের সামাজিক ও মানবিক গুণাবলিগুলো লোপ পেতে শুরু করে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, একটি গাছের সঠিক বৃদ্ধির জন্য যেমন রোদ, পানি ও মুক্ত বাতাসের প্রয়োজন, তেমনি একটি শিশুর মানসিক বৃদ্ধির জন্যও আনন্দ, খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশা অপরিহার্য। মা-বাবা হিসেবে আমাদের কাজ শুধু সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া বা স্কুল ড্রেস গুছিয়ে দেওয়া নয়; তাদের আবেগ-অনুভূতির যত্ন নেওয়া এবং তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলাও আমাদের সমান দায়িত্ব।
অনেক সময় দেখা যায়, অভিভাবকরা নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার জেদ সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। নিজের সন্তান ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে-এমন অবাস্তব প্রত্যাশা অনেক সময় কোমলমতি মনে তীব্র মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। অথচ কে কোন ক্ষেত্রে প্রতিভাবান বা কিসে তার প্রকৃত সুখ, তা খুঁজে বের করার কাজটিই হওয়া উচিত বুদ্ধিমান অভিভাবকের প্রধান লক্ষ্য।
একটি শিশুকে বড় করে তোলার বিষয়টি কেবল খাওয়াদাওয়া বা স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে দায় সারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মনস্তাত্ত্বিক পরিচর্যা ও স্নেহপূর্ণ বন্ধন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পাঠদান করেন ঠিকই, কিন্তু সেই শিক্ষার ভিত তৈরি হয় মূলত পারিবারিক আবহে। তাই অভিভাবক হিসেবে আপনার সজাগ দৃষ্টি, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং আন্তরিক মানসিকতাই পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সাথে হাত মিলিয়ে একটি সুদৃঢ় ও কার্যকরী সেতু তৈরি করতে। শিক্ষক ও অভিভাবকের এই সম্মিলিত ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক প্রয়াসই পারে একটি শিশুর সঠিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি প্রজন্মের সুস্থ মানসিক বিকাশ মানেই আগামীর একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী। আসুন, অন্ধ মোহের মোহগ্রস্ততা কাটিয়ে আমরা আমাদের সন্তানকে কেবল একটি ভালো ছাত্র বানানোর যান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে বের করে আনি এবং সবার আগে একজন সুস্থ, আনন্দিত, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক গুণসম্পন্ন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি। এম. আরিফুজ্জামান, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর,