প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক গ্রেফতারেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন অপরাধে দেশজুড়ে প্রতিদিন পুলিশ গড়ে দেড় সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। চলতি বছরের ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ১১৮ দিনে বিশেষ অভিযান এবং অন্যান্য মামলায় মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব অভিযানে পুলিশ ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করেছে। কিন্তু তাতেও নিয়ন্ত্রণে আসছে দেশজুড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বরং অহরহ ঘটছে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দেশে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু লাগাতার পুলিশি অভিযান ও গ্রেফতারের মধ্যেও চলতি বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরে বেশ কিছু ক্যাটাগরিতে বেড়েছে অপরাধ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খুনের ঘটনা। পুলিশের নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে বিপুলসংখ্য গ্রেফতারের পাশাপাশি উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র, গুলি, মাদক ও দেশীয় অস্ত্র। কিন্তু তার মধ্যেও চলমান রয়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ।
সূত্র জানায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে গ্রেফতার। পুলিশ অপরাধীতের গ্রেফতার করলেও পরবর্তীতে সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ফলে অপরাধীরা তার সুযোগ নিচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গত ১ অক্টোবর থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে ৫ হাজার ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। ওই সময়ে গড়ে প্রতিদিন ৪৫৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আর একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে ৫৮০টি মামলা হয়েছে। আর সেপ্টেম্বরে সারা দেশে ২৯৭টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। যদিও সব ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আরো বেশি। একাধিক জায়গায় জোড়া খুনের ঘটনাও ঘটেছে। তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ৫৭টি খুন হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা রেঞ্জ ঘটেছে ৫৩টি খুন। আর মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে ডিএমপিতে সবচেয়ে বেশি ৩১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর গত আগস্টে দেশজুড়ে ২৮৬টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ৮৬টি ছিলো সবচেয়ে বেশি।
সূত্র আরো জানায়, দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী খোদ পুলিশ বাহিনীর সদস্যই ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। খুলনা জেলায় রাতের বেলা পুলিশ সদস্যদের একা চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাছাড়া বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিট ইনচার্জদের প্রতি ওই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত ৯ অক্টোবর রাতে যশোর জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সুপার স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে ওই নির্দেশনার কথা জানানো হয়। মূলত অতিসম্প্রতি বিশেষ অভিযান পরিচালনা শেষে গভীর রাতে রূপসা থানায় ফেরার পথে এক পুলিশ পরিদর্শক ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হয়। ঘটনার সময় ওই পুলিশ কর্মকর্তা সাদা পোশাকে ছিলো। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরই মূলত জেলা পুলিশের প্রত্যেক সদস্যের সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনা করে রাতের বেলায় একা চলাচলের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছে। যদিও প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই জড়িতদের গ্রেপ্তারসহ অপরাধ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশ বাহিনী অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। কোনো ঘটনার পর জড়িতরা যেমন গ্রেফতার হচ্ছে, একইভাবে ওসব ঘটনা যেন না ঘটে সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিচ্ছে। সামপ্রতিক সময়ে প্রায় ১০ হাজার কিশোর গ্যাং সদস্য আটক হয়েছে। তাছাড়া মাদক-সংক্রান্ত গ্রেফতার বেড়েছে প্রায় চারগুণ।
অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন ঘটনার পর যারা অভিযুক্ত বা যাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, তাদের একটা অংশ গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু গ্রেফতার তো বিচার না। ফলে শুধু গ্রেফতারর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বা মানুষকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে খুব একটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না। কারণ তারপর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার জরুরি হলেও তা হচ্ছে না। বরং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত বিচারের আগেই আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়াচ্ছে। গ্রেফতার শুধু সাময়িক স্বস্তি তৈরি করলেও মোটা দাগে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।