বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়ছে সরকারের

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১০ এএম
বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়ছে সরকারের

অর্থবছরের শুরুতেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের তীব্র চাপের মুখে পড়েছে সরকার। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণ ও সহায়তার অর্থছাড় আশঙ্কাজনক হারে কমলেও অতীতে নেওয়া মেগা ও বড় প্রকল্পগুলোর সুদাসল মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর ব্যয়ভার বহুগুণ বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) বিদেশি সহায়তার রূপ যে অর্থ বাংলাদেশে এসেছে, তার তুলনায় আড়াই গুণেরও বেশি অর্থ পুরোনো ঋণ পরিশোধেই চলে গেছে। একই সঙ্গে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ শোধ বাবদ ব্যয় বেড়েছে প্রায় পৌনে পাঁচ শতাংশ। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার নতুন অর্থপ্রবাহ থমকে যাওয়া এবং অন্যদিকে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি পাওয়া সরকারের রিজার্ভ ও সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে টানাপোড়েনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট মাসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান বাবদ মাত্র ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার বা সাড়ে ২৯ কোটি ডলারের কিছু বেশি অর্থ বাংলাদেশে ছাড় করেছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশগুলো। অথচ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ডলার কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পাওয়া এই অর্থছাড়ের পুরোটাই প্রায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে এসেছে, যেখানে অনুদানের পরিমাণ ছিল নগণ্য-মাত্র ৩১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। মূল উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার, জাপান ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ভারত ৩ কোটি ৩ লাখ ডলার এবং রাশিয়া ২ কোটি ৬ লাখ ডলার ছাড় করেছে। বিপরীতে গত দুই মাসে চীন ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) মতো বড় উৎস থেকে কোনো অর্থই ছাড় হয়নি। পাশাপাশি নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতিতেও স্থবিরতা দেখা গেছে, যা আগের বছরের ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার থেকে কমে ২৪ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারে নেমে এসেছে। নতুন অর্থ পাওয়ার গতি শ্লথ হলেও আগের মেয়াদে নেওয়া ঋণের দায় মেটাতে গিয়ে সরকারকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা গুণতে হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে মোট ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার বিদেশি ঋণ শোধ করেছে বাংলাদেশ, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এই শোধের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ১০ হাজার ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেবল প্রথম দুই মাসেই বিদেশি ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত ৩ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার ডলার বা প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। সরকারের পরিশোধ করা এই ঋণের একটি বড় অংশই গেছে আসল মেটাতে। প্রথম দুই মাসে মূল ঋণ বাবদ ৫১ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার (প্রায় ৬,৩৬৯ কোটি টাকা) শোধ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে কেবল সুদ বাবদই বিশ্ববাজার ও বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে পাঠাতে হয়েছে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার (প্রায় ২,২৫৭ কোটি টাকা), যা আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। পরিশোধের এই ক্রমবর্ধমান চাপ এবং নতুন অর্থপ্রবাহ হ্রাসের মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বিগত বছরগুলোতে নেওয়া ঋণের ধরন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিকে দায়ী করছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, অতীতে বৈদেশিক ঋণে যেসব বড় উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বা গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে এখন মূল পরিশোধের ধাপে পৌঁছেছে। ফলে দেশের বাইরে অর্থ যাওয়ার হার বা ‘আউটফ্লো’ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বিপরীতে নতুন অর্থ আসার হার বা ‘ইনফ্লো’ কমে যাওয়ায় বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় না হলেও পাইপলাইনে আটকে থাকা ঋণের জন্য বাংলাদেশকে নিয়মিত ‘কমিটমেন্ট ফি’ দিতে হচ্ছে, যা সরকারের জন্য দ্বিগুণ চাপ। পাশাপাশি প্রকল্পের দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই, রাজনৈতিক বিবেচনায় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে সময় ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রকল্প থেকেই আশানুরূপ অর্থনৈতিক রিটার্ন মিলছে না; অথচ ঋণের চড়া দায় ঠিকই অপরিবর্তিত থাকছে। অর্থনীতির এই ঘাটতি ও ঋণ সুরক্ষার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও। তিনি জানান, সাধারণত অর্থবছরের প্রথম দিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে শ্লথগতি থাকে, যা অর্থছাড় কমার অন্যতম কারণ। তাছাড়া আইএমএফের কর্মসূচি কিংবা নীতিভিত্তিক সরাসরি বাজেট সহায়তা সীমিত থাকায় এককালীন বড় কোনো বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। তিনি মনে করেন, বিদেশি ঋণ নেওয়াটা কোনো ভুল পদক্ষেপ নয়, মূল প্রশ্ন হলো সেই ঋণ সঠিক উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ঋণের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেখা যায়নি। ঋণ নিয়ে যদি ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি না হয়, তবে এই ঋণ শোধের চাপ দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। পরিস্থিতি সামলাতে প্রকল্প গ্রহণে কঠোর শৃঙ্খলা আনয়ন, অহেতুক অপচয় বন্ধ এবং পাইপলাইনের অর্থ দ্রুত ব্যবহারে সরকারকে আরও বেশি দক্ষতার পরিচয় দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে