কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মোহাম্মাদ মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে পাঠানো এক ই-মেইল বার্তায় তাঁর নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, হিসাব খোলার ফরম, গ্রাহকের পরিচিতি সংক্রান্ত তথ্য বা কেওয়াইসি, হিসাব বিবরণী এবং লেনদেনের প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে।
বিএফআইইউর পাঠানো বার্তায় সালমান মুক্তাদিরের নামে থাকা হিসাবগুলোর কেওয়াইসি ও হিসাব বিবরণীর সফট কপি দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত এক্সেল ফাইলে হিসাবসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য এবং চিহ্নিত প্রতিটি হিসাবের সুদ আয় ও উৎসে কর বা টিডিএসের তথ্য পূরণ করে পাঠাতে বলা হয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে পাঠানো ওই ই-মেইলকে উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এসব তথ্য এক ঘণ্টার মধ্যে গোএমএল মেসেজ বোর্ডের মাধ্যমে পাঠাতে বলা হয়। একই সঙ্গে বিএফআইইউর একটি পরিপত্রের সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে তলব করা তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশের সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে এই বার্তা পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা চিঠি বা ই-মেইল পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, ব্যাংকে সালমান মোহাম্মাদ মুক্তাদিরের নামে হিসাব থাকলে তার হিসাব খোলার ফরম ও লেনদেনের তথ্য দেওয়া হবে, আর হিসাব না থাকলে সেটিও জানানো হবে।
বিএফআইইউর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের তথ্যের প্রয়োজন হলে ব্যাংকের কাছ থেকে তা চাওয়া হয়। সালমান মুক্তাদিরের বিষয়টি বর্তমানে আলোচিত হওয়ায় আগেভাগেই তাঁর আর্থিক লেনদেনের তথ্য নিয়ে রাখা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে ভবিষ্যতে তাঁর আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হলে যেন বিএফআইইউ তা সরবরাহ করতে পারে, সে জন্যই হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
বিএফআইইউর ই-মেইলে লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারা প্রযোজ্য হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলবের বিষয়টি সামনে এলো রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজে তাঁর ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে। গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পর সালমান মুক্তাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে প্রথমে বিএনপির লোকজনের বিরুদ্ধে তাঁর কাছে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ তোলেন। পরে তিনি জানান, তাঁর কাছে চাঁদা চাওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্যের এই পরিবর্তন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়।
হামলার পর রাতে দেওয়া একটি ভিডিওতে সালমান মুক্তাদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।”
তবে নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় যে মামলা করেন, সেখানে জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার জেরে হামলার কথা বলা হয়েছে। মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ জনকে।
পুলিশ ও ডিবি এখন পর্যন্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং কুষ্টিয়া-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানসহ সাতজন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
হামলার কারণ নিয়ে সালমান মুক্তাদিরের চাঁদাবাজির অভিযোগের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধটি নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে। ওই জমিতে থাকা বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওও হামলার শিকার হয়। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথাও তিনি জানান।
পুলিশও হামলার পেছনে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কথা বলেছে। ক্যান্টনমেন্ট থানার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রবেশপথ ও চলাচল নিয়ে বিরোধের জেরে একদল লোক সেখানে হামলা চালায়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
হামলার পর সালমান মুক্তাদির জানান, ঘটনার রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ প্রথমে মামলা নিতে চায়নি। পরে মামলা গ্রহণ করা হয়।
এদিকে ২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সালমান মুক্তাদিরসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি ও ভাইরাল জনপ্রিয়তা পাওয়া কনটেন্ট নির্মাতাদের আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনার আশা প্রকাশ করেন।
সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলবের এই তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন তাঁর কার্যালয়ে হামলার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে।