জানুয়ারিতে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল, পাসের পর গণভোট

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
জানুয়ারিতে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল, পাসের পর গণভোট
ছবি: সংগ্রহীত

আগামী বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের বিল উঠতে পারে। সংসদে বিলটি পাস হওয়ার পর যেসব বিষয়ে সাংবিধানিকভাবে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলোতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে সংবিধানের মূলনীতিতে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের গণমাধ্যম সেন্টারে বিশেষ কমিটির তৃতীয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এর আগে দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কমিটি। প্রায় দুই ঘণ্টার ওই বৈঠকে সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত নেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মতবিনিময় সভায় জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, বিভিন্ন জার্নালিস্ট ফোরামের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ, তফসিল এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে বিস্তারিত মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকে লিখিত প্রস্তাবও দেবেন। এসব মতামত ও আলোচনার ভিত্তিতে রিপোর্ট ও পুস্তিকা তৈরি করা হবে।

তিনি বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ বেশ কিছু অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোটের প্রয়োজন হবে।

গণভোটের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে জনগণের গণভোট প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি। বিল পাসের পরই সেই সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গণভোটের বিধান রাখার প্রস্তাব এসেছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দলটি ১৭ বছর ধরে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করেছে, ভবিষ্যতের কোনো সংসদ যাতে সহজে তা বাতিল করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গণভোট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের কাজে বিরোধীদলের অংশগ্রহণ নিয়েও কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্পাদক ও সাংবাদিকদের অনেকে বিরোধীদলের সদস্যদের কমিটিতে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তারাও এ বিষয়ে একমত। বিরোধীদলকে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং তারা কমিটিতে যোগ দিলে স্বাগত জানানো হবে। বিভক্তি এড়িয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করার কথাও জানান তিনি।

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব বিষয়ে ম্যান্ডেট পাওয়া গেছে, সেগুলোও সংশোধন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

এর অংশ হিসেবে সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনার কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত ৮ অনুচ্ছেদে এটি যুক্ত করেছিলেন। এটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বলেও জানান তিনি।

কমিটির কাজের সময়সীমা নিয়েও পরিকল্পনা জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ডিসেম্বরের মধ্যেই বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা চলছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংবিধান সংশোধনের বিল তৈরি করা হবে। এরপর জানুয়ারির প্রথম অধিবেশনে বিলটি সংসদে তোলার আশা করছে কমিটি। সংসদে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে বিল পাস হলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলোতে গণভোটের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করা হবে। 

জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে বিশেষ কমিটির অবস্থানও তুলে ধরা হয়। বৈঠক শেষে দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানে কিছু মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হয় এবং এমন পরিবর্তন আনা হলে গণভোট হবে বলে কমিটির পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা, সরকারি নিয়োগে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। মূল প্রস্তাবে বিরোধীদল থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি রাখার কথা থাকলেও তারা কোনো নাম দেয়নি। পরে ১২ সদস্যের কমিটিই গঠন করা হয়। 

বর্তমানে কমিটি রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় করছে। ২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর কমিটির সভাপতি জানিয়েছিলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে এগিয়ে যেতে চান তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোববার আবারও গণমাধ্যম ও সম্পাদকদের মাধ্যমে বিরোধীদলগুলোকে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানান।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে