দেশের বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতা আনতে সৌরবিদ্যুতে জোর দিচ্ছে সরকার

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১২ এএম
দেশের বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতা আনতে সৌরবিদ্যুতে জোর দিচ্ছে সরকার

দেশের বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতায় জোর দিচ্ছে সরকার। ওই লক্ষ্যে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ৩ বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৫ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নেট মিটারিং ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বড় পরিবর্তন আসবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি মিশ্রণে। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, এলএনজি, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমবে। ফলে কমে আসবে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, আমদানি করা জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সামপ্রতিক জ্বালানিসংকটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ওই লক্ষ্যে বড় আকারের গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেয়া হচ্ছে। সেজন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে দ্রুত দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নগরাঞ্চলে নির্দিষ্ট স্থানে ৭০ মেগাওয়াট এবং ন্যূনতম ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।

সূত্র জানায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে নেট মিটারিং সমপ্রসারণ সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সেজন্য নতুন আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিদ্যমান প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। যাতে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ে। নেট মিটারিং সহজ হলে গ্রাহক নিজস্ব ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকবে। ওই ব্যবস্থায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ভবন, প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ভবনে রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যাতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানো যায়।

সূত্র আরো জানায়, দেশে এখনো তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। কিন্তু গ্রিডে ৫ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হলে বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি মিশ্রণে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। কারণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, এলএনজি, তেল বা কয়লার প্রয়োজন হয় না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে ওসব জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। তাতে জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। আর শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে প্রচলিত বিদ্যুতের চাহিদার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

এদিকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্রকৌশল ও নির্মাণ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার হলেও তাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জনের জন্য দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন, জমি নির্বাচন, অর্থায়ন, গ্রিড সংযোগ ও টেন্ডার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দূর করতে হবে নেট মিটারিংয়ের বিদ্যমান জটিলতাও।

এদিকে এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আগামী ৩ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জানান, লক্ষ্য অর্জনে সুস্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্প অনুমোদন, জমি, গ্রিড সংযোগ, নেট মিটারিং, বিদ্যুৎ ক্রয়সহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাগত বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান— নিতে সার্কুলার জারি করতে হবে। ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ একটি বড় বিনিয়োগ কর্মসূচি। সেজন্য ব্যাংকার, ফাইন্যান্সার, বিনিয়োগকারী, ইপিসি এবং আরইএসসিও প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, নেট মিটারিং ব্যবস্থা দ্রুত সমপ্রসারণ করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচক ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আবেদন অনুমোদন, সংযোগ এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। নেট মিটারিংয়ের সুযোগ যত সহজ ও দ্রুত করা যাবে, শিল্প-কারখানাগুলো তত বেশি রুফটপ সোলারে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। তাতে শিল্পের বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে।