চলতি বছর বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরু থেকে দেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই ৫ বছরের কম বয়সী। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আক্রান্তের হার বেশি। গত ১৫ মার্চ থেকে নিয়মিত হাম পরিস্থিতির প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দৈনিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়েও সংক্রমণের ধারায় স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ আসেনি। বরং জুন ও জুলাইয়ে কিছুটা কমার পর আগস্ট মাসে ফের বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশে হাম উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৯৯১ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ১০০ এবং সন্দেহজনিত মৃত্যু ৯৯১। একই সময়ে সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫ জন। এ ছাড়া পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত ১৯,৬৪১ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ২১৪ জন। যদিও হামের সংক্রমণ করে গিয়েছিল। তবে আগস্টে ফের বাড়তে শুরু করে হামের প্রাদুর্ভাব। গত জুলাইয়ে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত রোগী মিলিয়ে মোট আক্রান্ত ছিল ৩১ হাজার ৩২৭ জন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৯৩৪ জনে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ২৬ হাজার ৩৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭ হাজার ৪৫৮। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জুলাইয়ে ১১৯ জনের মৃত্যুর বিপরীতে আগস্টে মৃত্যু হয়েছে ১৩৬ জনের। টিকাদান কর্মসূচির পর সাময়িক স্বস্তি এলেও সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। আর সেপ্টেম্বরের শুরুতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গতকাল শুক্রবারও নতুন আরও ১ হাজার ১১৪ শিশু হামজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। বর্তমান হামের পরিস্থিতিতে পুনরায় জোরালোভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন, বিশেষ করে ‘ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকা প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিভাবক এখনও হামকে একটি সাধারণ রোগ হিসেবে দেখেন, যা স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়। এই ধারণাটি কেবল ভুলই নয়, ভয়াবহও। বাস্তবে এটি একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা দেওয়া, আক্রান্ত শিশুকে যথাসম্ভব আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে প্রতিটি পরিবারে নিশ্চিত করা জরুরি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।