তারেক রহমান, ভারত ও আ. লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা বললেন শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম
তারেক রহমান, ভারত ও আ. লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা বললেন শেখ হাসিনা
ছবি: দ্য ওয়াল

দেশে ফিরতে চান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাঁকে হত্যা করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিজের নিরাপত্তা, তারেক রহমান, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

দেশ ছাড়ার পর ভারতের কোনো সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এটিই শেখ হাসিনার প্রথম টেলিফোনিক সাক্ষাৎকার বলে দ্য ওয়ালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি। একই সঙ্গে দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে তাঁর সঙ্গে যুক্ত অন্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

দেশে ফিরতে চান কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ তাঁর নিজের দেশ। তাঁকে কেন দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তবে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আমি ফিরলে এয়ারপোর্টেও আমাকে হত্যা করতে পারে।”

শুধু নিজের নিরাপত্তা নয়, দেশে ফেরার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত অন্যদের নিয়েও উদ্বিগ্ন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “প্রত্যেকের জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি দেশে ফেরার জন্য নির্দেশনা দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলতে চাই না।”

আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা শেখ হাসিনা আগেই জানিয়েছিলেন। দ্য ওয়ালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও দেশে ফেরার সেই ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোমবার ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে ভারত চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁর অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তাঁর বোন শেখ রেহানা আসছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। দলের সাংগঠনিক দায়িত্বে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের থাকার কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

শেখ রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নয়।”

এরপর দলের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, এমন প্রশ্নে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম উল্লেখ করেন তিনি। শেখ হাসিনার ভাষায়, “এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।”

তবে আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতা শেখ সেলিমকে নেতৃত্বে আনার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের একজনের অভিযোগ, শেখ সেলিমের বাসায় বিভিন্ন সময়ে হওয়া দলীয় বৈঠকের আলোচনা দ্রুত বাইরে চলে যায়।

আরেক আওয়ামী লীগ নেতা শেখ সেলিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন।

শেখ সেলিমের বড় ছেলে শেখ ফজলে ফাহিমের সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বোন ন্যান্সি জাহারার বিয়ে হয়েছে। তাঁর ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নাঈমের বিয়ে হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মেয়ে সারাহ হাসিন মাহমুদের সঙ্গে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, দেশে জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীদের উত্থানের খেসারত ভারতকেও দিতে হবে।”

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অস্থিরতা এবং মৌলবাদী শক্তির বিস্তার ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

সামরিক জোটের পরিবর্তে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

সাক্ষাৎকারে বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে নিয়েও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে দর-কষাকষির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দর কষাকষি আসলে নিজের দেশকেই খাটো করা।”

শেখ হাসিনার অভিযোগ, তারেক রহমান একসময় রাজনীতি না করার মুচলেকা দিয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন। পরে বিদেশে অবস্থান করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তারেক রহমান লন্ডন থেকে সহিংসতার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, “তারেক জিয়া লন্ডন থেকে নির্দেশ দেয়, লাশ ফেলো। সরকার পড়ে যাবে।”

এটি শেখ হাসিনার অভিযোগ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে নয়াদিল্লির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “ভারত সরকার কী ভেবে বাংলাদেশের নির্বাচন সমর্থন করল, তারেককে ফিরিয়ে আনল, সেটা ভারত সরকারই ভালো বলতে পারবে।”

তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বোঝাপড়া ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও মত দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। দেশের বর্তমান অবস্থা তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার তো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, যখন দেখছি আমার দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।”

একদিকে দেশে ফেরার ইচ্ছা, অন্যদিকে নিজের ও দেশে ফেরার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা, সাক্ষাৎকারে দুই বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যে তাঁর দেশে ফেরার পরিকল্পনার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জঙ্গিবাদের অভিযোগ, তারেক রহমানের ভূমিকা, ভারতের অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে