আগস্ট মাসে দেশে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৬৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৫৮ জন শিশু। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় দৈনিক গড় প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের স্বাক্ষরিত আগস্ট মাসের সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৩ দশমিক ৪১ জন নিহত হয়েছিলেন। আগস্টে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৫১ জনে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক গড় প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে তারা আগস্টের দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেশি
আগস্টে ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। মোট ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনার হিসাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এসব দুর্ঘটনায় ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মাসটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
এ ছাড়া ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ২১ দশমিক ২০ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৭ জন, মোট নিহতের ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।
যানবাহনভিত্তিক হিসাবে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন। বাসের যাত্রী নিহত হয়েছেন ৩৭ জন। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, লরি ও ড্রাম ট্রাকের আরোহী নিহত হয়েছেন ৫১ জন।
মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও জিপের আরোহী নিহত হয়েছেন ১১ জন। থ্রি-হুইলার, অর্থাৎ অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনার যাত্রী নিহত হয়েছেন ৭৮ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, ভটভটি ও মাহিন্দ্রার যাত্রী নিহত হয়েছেন ২১ জন। রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন পাঁচজন।
আগস্টে মোট ৭৪৯টি যানবাহন দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৯৪টি, থ্রি-হুইলার ১১২টি, ট্রাকসহ সংশ্লিষ্ট মালবাহী যান ১০৮টি এবং বাস ১০৩টি ছিল। দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের হিসাবে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপসহ মালবাহী যানবাহনের অংশ ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশ, থ্রি-হুইলার ১৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং যাত্রীবাহী বাস ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এ ছাড়া মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপ ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যান ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ, রিকশা ও বাইসাইকেল ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং অজ্ঞাত যান ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল।
সড়কের ধরন অনুযায়ী আগস্টে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এ ধরনের সড়কে ২১৭টি দুর্ঘটনা হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ।
এ ছাড়া জাতীয় মহাসড়কে ১৬৩টি, গ্রামীণ সড়কে ৬২টি এবং শহরের সড়কে ৭১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এসব দুর্ঘটনা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৮ শতাংশ। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ১২৬টি। পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ১০৬টি এবং অন্য যানবাহনের পেছনে আঘাত করার ঘটনা ৭৮টি। অন্যান্য কারণে ঘটেছে আটটি দুর্ঘটনা।
সময় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার মধ্যে রাতে সবচেয়ে বেশি ২০ দশমিক ০৭ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে আগস্টে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৭২টি দুর্ঘটনায় ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম ১৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে। সেখানে নিহত হয়েছেন ১৪ জন।
একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৩৭ জন নিহত হয়েছেন বগুড়া জেলায়। রাজধানী ঢাকায় আগস্টে ৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি আগস্টে সাতটি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ছয়জন নিহত ও নয়জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে ৩৪টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ঘটছে। এর পাশাপাশি বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, চালকদের অদক্ষতা, শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচলকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা কমাতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল বা এনআরএসসি পুনর্গঠন এবং বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে প্রত্যাহারের কথা বলেছে সংস্থাটি।
রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাসসেবা চালুরও সুপারিশ করা হয়েছে। দক্ষ চালক তৈরির পাশাপাশি তাঁদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগের সুপারিশও রয়েছে।
সংস্থাটির মতে, সময়োপযোগী নীতিমালা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।