মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন নয় তেহরান

নিজস্ব প্রতিবেদন
| আপডেট: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম | প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন নয় তেহরান
ছবি: সংগ্রহীত

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না তেহরান। একই সঙ্গে এ চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে ঢাকার সিদ্ধান্ত নিয়েও ইরান উদ্বিগ্ন নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত হোসেইন জালিল রহিমি জাহানাবাদি।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে বলে তেহরান জানে। তাই বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত ইরানকে চিন্তিত করে না। তাঁর ভাষায়, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকেও ইরানের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি হিসেবে দেখছে না তাঁর দেশ।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কোনো চ্যালেঞ্জ বা বিরোধ নেই। তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ভালো বন্ধু হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। সৌদি আরবের সঙ্গেও ইরানের সুসম্পর্ক রয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।

জাহানাবাদি মনে করেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি লক্ষণ। তাঁর বক্তব্য, আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতার বদলে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রসঙ্গও তোলেন ইরানের রাষ্ট্রদূত। তিনি দাবি করেন, ওই সময় ইরান কোনো আরব দেশের ভূখণ্ডে হামলা চালায়নি। বরং আরব দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থে গঠিত হচ্ছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত তা নাকচ করেন। তিনি বলেন, চুক্তিটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

জাহানাবাদি বলেন, বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা ছিল, সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য জায়গা দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বিনিময়ে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে।

তাঁর দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানেও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের যুক্তি দেখিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকার পরিবর্তন, দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং বিশ্বে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন।

তবে এসব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি দাবি করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো তাদের হাতেই রয়েছে। তাঁর দাবি, গত রাতেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে।

হরমুজ প্রণালি বা সমুদ্রপথ খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে বলেও মন্তব্য করেন জাহানাবাদি। তাঁর দৃষ্টিতে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়ের একটি সম্পূরক অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের স্তূপ তাদের প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইরান নিজে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কি না, জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, তেহরান নিজ থেকে এমন কোনো প্রস্তাব দেয়নি। তবে চুক্তির সদস্যদেশগুলো ইরানকে যোগ দেওয়ার আহ্বান বা প্রস্তাব দিলে তা বিবেচনা করবে তাঁর দেশ।

প্রায় এক দশক আগে মক্কা চুক্তির মতো আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ইরান দুটি প্রস্তাব দিয়েছিল বলেও জানান জাহানাবাদি। এর একটি ছিল পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য গঠন, যাতে অঞ্চলের কোনো দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে। তাঁর দাবি, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাব সমর্থন করেনি।

দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সব ইসলামিক দেশের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। রাষ্ট্রদূতের দাবি, সে সময় আরব দেশগুলো এ প্রস্তাব সমর্থন করেনি। কারণ তারা মনে করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাই তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট।

এ প্রসঙ্গে বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডানের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে জাহানাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কি তাদের কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা দিতে পেরেছে? তাঁদের আকাশসীমা অতিক্রম করে ইরানের যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তেল আবিবের দিকে গেছে, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো থামাতে পেরেছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা দ্রুত কমানোর প্রত্যাশা জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসহ এর বাইরের মানুষের স্বার্থে বাংলাদেশ চলমান উত্তেজনার দ্রুত অবসান এবং স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। রোববার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, বাংলাদেশ এ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি দেখছে না। আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার আলোকে উদ্যোগটিকে তিনি ‘অনন্য’ ও নতুন সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘মক্কা বাংলাদেশের হৃদয়ে।’

তবে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করে। চুক্তিতে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে চুক্তিটি নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে তেহরান যে চুক্তিটিকে সরাসরি ইরানবিরোধী উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না, সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে