ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় ৫০ কিলোমিটারজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুর থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত চলা এই যানজটে দূরপাল্লার বাসের যাত্রী, চালক, পরিবহন শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। দীর্ঘ সময় একই স্থানে আটকে থাকায় নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জের আষাঢ়িয়ার চর ব্রিজ থেকে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত ঢাকামুখী লেনে যানজট ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার বিকেলের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। কোথাও গাড়ি ধীরগতিতে চললেও অধিকাংশ জায়গায় দীর্ঘ সময় যানবাহন প্রায় স্থির ছিল।
সড়ক বিভাগ ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আষাঢ়িয়ার চর ব্রিজের ঢাকামুখী অংশে বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে জরুরি সংস্কারকাজ শুরু করা হয়। কাজ চলার সময় মহাসড়কের ঢাকামুখী দুই লেনের একটি বন্ধ রেখে অন্য লেন দিয়ে পর্যায়ক্রমে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে গর্ত তৈরি হয়। এতে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় ঢাকামুখী অংশে বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় সেখানে জরুরি সংস্কারকাজ নেওয়া হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী আল রাজী জানান, আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় মহাসড়কের প্রায় পাঁচ মিটারজুড়ে থাকা গর্তে মাইক্রোকংক্রিট ঢালাই দেওয়া হয়েছে। ঢালাই শক্ত হয়ে যান চলাচলের উপযোগী হতে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন ছিল। এ কারণে একটি লেন বন্ধ রেখে অপর লেন দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।
একটি লেন বন্ধ থাকায় মহাসড়কের স্বাভাবিক যানবাহনের চাপ সামলাতে গিয়ে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পরে যানজট আষাঢ়িয়ার চর থেকে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রেম দাস রায় বলেন, আষাঢ়িয়ার চর ব্রিজ এলাকায় সড়ক সংস্কারকাজের কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। একটি লেন বন্ধ থাকায় ওই অংশে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি সফিউল ইসলাম বলেন, আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় মহাসড়কের একটি লেনে জরুরি সংস্কারকাজ চলছিল। ফলে একটি লেন দিয়ে পর্যায়ক্রমে যানবাহন পারাপার করতে হয়েছে। এতে ওই এলাকায় যানজট তৈরি হয়।
তিনি জানান, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক দল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছে। দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ যানজটে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি বিদেশগামী যাত্রীরাও বিপাকে পড়েন। অনেক বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় আটকে থাকে।
স্টার লাইন পরিবহনের চালক শাহিন আহমেদ জানান, দীর্ঘ সময় ধরে যানজটে আটকে থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। মহাসড়কে যানবাহনের স্বাভাবিক চাপের সঙ্গে একটি লেন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এক বাসযাত্রী মাহাবুব আলম জানান, তিনি সন্ধ্যায় কুমিল্লা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্তও দাউদকান্দিতে পৌঁছাতে পারেননি। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় আটকে থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়।
আরেক যাত্রী খাদেমুল জানান, তিনি রাত থেকেই বাসে আটকে ছিলেন। কখন যান চলাচল স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। বাসের ভেতরে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বলে জানান তিনি।
যানজটে আটকে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইসলামী বক্তা আলী হাসান ওসামা। এক পোস্টে তিনি জানান, রাত সাড়ে ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গৌরীপুর এলাকায় আটকে ছিলেন। সকাল ৮টায় ঢাকায় তাঁর একটি অনুষ্ঠান থাকলেও যানজটের কারণে সময়মতো সেখানে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সেন্টমার্টিন পরিবহনের চালক হুমায়ুন আজাদ জানান, কুমিল্লার চান্দিনা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়েছে। তিনি প্রায় আট ঘণ্টা ধরে যানজটে আটকে ছিলেন।
শনিবার সকালে সংস্কারকাজের জন্য বন্ধ থাকা লেনটি খুলে দেওয়া হয়। এরপর আষাঢ়িয়ার চর ব্রিজ এলাকায় দুই লেন দিয়েই যানবাহন চলাচল শুরু করে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে আটকে থাকা যানবাহনের সারি পুরোপুরি সরতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি সফিউল ইসলাম বলেন, সকালে আষাঢ়িয়ার চর ব্রিজের বন্ধ থাকা লেনটি খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন দুই লেন দিয়েই যানবাহন চলাচল করছে এবং ধীরে ধীরে যানজট কমছে।
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার কারণে বিভিন্ন স্থানে চালকেরা ক্লান্ত হয়ে গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরে সড়কে যান চলাচল শুরু হলেও অনেক চালক ঘুমিয়ে থাকায় গাড়ির সারি দ্রুত সরানো সম্ভব হয়নি। এ কারণেও যানজট পুরোপুরি কমতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী আল রাজী জানান, সংস্কারকাজের জন্য বন্ধ থাকা লেনের ঢালাই শক্ত হয়ে যাওয়ার পর শনিবার সকালে সেটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে আষাঢ়িয়ার চর ব্রিজ এলাকায় এখন দুই লেনেই যানবাহন চলাচল করছে। তবে প্রায় ৫০ কিলোমিটারজুড়ে তৈরি হওয়া যানবাহনের দীর্ঘ সারি পুরোপুরি সরতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে।