‘আমি আর জামিন চাই না’, ট্রাইব্যুনালে দীপু মনি

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
‘আমি আর জামিন চাই না’, ট্রাইব্যুনালে দীপু মনি
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে নিজের জামিন আবেদন প্রত্যাহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি। স্বামী তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুর পর বাসায় ফেরার প্রয়োজনও আর অনুভব করছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি এখন জামিন চাই না। আমি জামিন আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই।”

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় দীপু মনিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ হাজির করা হয়। এদিন তাঁর জামিন শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল।

শুনানি শুরুর আগে কথা বলার অনুমতি চান দীপু মনি। ট্রাইব্যুনাল অনুমতি দিলে কাঠগড়ায় থাকা মাইক্রোফোনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি। সেখানে গত দুই বছর কারাবন্দি থাকা, অসুস্থ স্বামীর পাশে থাকতে না পারা এবং তাঁর মৃত্যুর পর নিজের জামিনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

দীপু মনি বলেন, “আমি দুই বছর ধরে কারারুদ্ধ আছি। গত এপ্রিল মাসে আমার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এখন আমি জামিন চাই না। আমি জামিন আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই।”

এর আগে জামিন শুনানির সময় ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বাসায় গিয়ে কী করবেন, এমন প্রশ্ন করেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এখন আমার আর বাসায় যাওয়ার দরকার নেই।”

নিজের স্বামী তৌফিক নেওয়াজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে দীপু মনি বলেন, তিনি সাত বছর ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন এবং তাঁর বাকশক্তিও ছিল না। কথা বললে চোখের পলক ফেলে উত্তর দিতেন। দীপু মনি জানান, পাঁচ বছর সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অসুস্থ স্বামীর যত্ন নিয়েছেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী দুই বছর তাঁকে বাড়ির বাইরে অজ্ঞাত স্থানে থাকতে হয়েছে। আশ্রিত অবস্থায় থাকায় দীপু মনি স্বামীর যত্ন নিতে পারেননি। এ জীবন তাঁর স্বামী মেনে নিতে পারেননি বলেও জানান তিনি।

গত ১৮ আগস্ট রাতে তৌফিক নেওয়াজ মারা যান। এর প্রায় চার মাস আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বলে জানান দীপু মনি। স্বামীর কাছে থাকার জন্য তখনই জামিন আবেদন করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দীপু মনি বলেন, “৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর শেষ সময়ে কাছে থাকতে পারেননি। এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমি আর কার কাছে যাব? সন্তানরা জামিন চায়। আমার বাসায় যাওয়ার আর তাড়া নেই।”

তাঁর বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনাল সমবেদনা জানিয়ে বলেন, দীপু মনির আবেদনের যৌক্তিকতা তাঁরা বুঝতে পারছেন। তবে মামলার ক্ষেত্রে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

দীপু মনির আইনজীবী সিফাত মাহমুদ পরে মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে দীপু মনির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের আইনে এক বছরের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে আসামিকে জামিন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ দীপু মনির পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়েছিল।

আইনজীবীর ভাষ্য, জামিন চাওয়ার মূল কারণ ছিল তৌফিক নেওয়াজের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং তাঁর পাশে থাকার প্রয়োজন। কিন্তু ১৮ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হওয়ায় সেই কারণটি আর বিদ্যমান নেই। এ কারণেই দীপু মনি আবেগাপ্লুত হয়ে জামিন আবেদন প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছেন।

হেফাজতের মামলা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে সিফাত মাহমুদ বলেন, হেফাজতের মামলা এবং মিসলেনিয়াস কেস ৩/২৪ দুটি আলাদা মামলা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান মামলাটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে, আর হেফাজতের মামলা ২০১৩ সালের ৫ মে’র ঘটনা নিয়ে। প্রতিটি মামলায় আলাদাভাবে জামিন নিতে হয় বলেও জানান তিনি। এই মামলায় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দীপু মনিকে আটকে রাখা হয়েছে দাবি করেই জামিন আবেদন করা হয়েছিল বলে জানান আইনজীবী।

অন্যদিকে প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম মামলার তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে বলেন, বিভিন্ন মামলায় প্রায় ২৫ জনের বিরুদ্ধে বিচার চলমান রয়েছে। আরও ১৩ জন আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত আছে। তদন্ত একসঙ্গে শেষ করার জন্য প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আরও তিন মাস সময় চাওয়া হয়েছিল।

তদন্তে সময় লাগার কারণ ব্যাখ্যা করে জি এইচ তামিম বলেন, এটি বড় একটি মামলা, যেখানে আসামি ৪৫ জন। অল্প কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দেওয়া হয়েছে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও হতাহতের সংখ্যা অনেক এবং ঘটনাস্থল সারা দেশে ছড়িয়ে থাকায় তদন্তে বেশি সময় লাগছে।

তিনি আরও জানান, যেসব ২৩ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে দাখিল করা হয়েছে, তাঁদের নাম মামলার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করা হলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেছেন। ফলে তাঁদের আর এই মামলায় হাজিরা দিতে হবে না।

এদিকে দীপু মনি মৌখিকভাবে জামিন আবেদন প্রত্যাহারের ইচ্ছা জানালেও আবেদনটি সরাসরি প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করা হয়নি। ডিফেন্স আইনজীবীর সম্মতিতে বিষয়টি মুলতবি রেখে পরবর্তী শুনানির জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এর অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে