বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮০ দিনে জনগণকে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসহ মোটা দাগে ২৯টি ক্ষেত্রে সরকার অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। দলটির পলিসি ও রিসার্চ বিষয়ক উপকমিটি এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপির সরকার ১৮০ দিনে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ মোটা দাগে ২৯টি জায়গায় অব্যবস্থাপনা এবং ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কোনোটিই তারা রক্ষা করতে পারেনি।’
জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভয়াবহ জ্বালানি তেল সংকট তৈরি হয়েছিল। সে সময় জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। এর প্রভাব গণপরিবহন, সেচ ও সারসহ বিভিন্ন খাতে পড়েছে। বর্তমানে গ্যাসের চাহিদার ৪৩ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, গ্যাস সংকটে ঢাকার অনেক বাসায় চুলা জ্বলছে না এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন কমেছে। গ্যাস সংকটের কারণে ক্রয়াদেশও চলে যাচ্ছে বলে দাবি করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে লোডশেডিং, ভুতুড়ে বিল ও ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নাহিদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারের ন্যূনতম দায় নেই। কোনো সংকট আসলে বিগত সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্লাবে পরিণত করেছে। তাঁর দাবি, বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত এবং নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানকে।
তিনি বলেন, গত ছয় মাসে ১৯ থেকে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৬৩টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয় লোকদের বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর দাবি, ছয় মাসে দেশে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৬৭০টি ঘটিয়েছে বিএনপি। দেশের বিভিন্ন স্থানে এনসিপির নেতাকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার সার্বিকভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরোধী মতাদর্শের মানুষের ওপর হামলার অভিযোগ উঠলেও কোনো বিচার হয়নি। শিক্ষাঙ্গন দখল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কৃষি খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষক সার পাচ্ছেন না এবং বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাত নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ। হাম মহামারির দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপানো হলেও সংকট এখনো কাটেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ছয় মাসেও কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল গঠন করা হয়নি।
এনসিপির আহ্বায়ক আরও অভিযোগ করেন, জুলাই জাদুঘর থেকে ফেলানিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্মৃতি চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে র্যাব বিলুপ্তির দাবি থাকলেও সরকার তা না করে নতুন নামে সংস্থাটিকে পুনর্গঠন করছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, শুধু নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতেই সরকার এ উদ্যোগ নিচ্ছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারাকে সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট ভারত সরকারের সহযোগিতাতেই দিল্লিতে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ। তিনি বলেন, সরকার পুরনো স্বৈরাচারী কায়দায় ফিরে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বলা হলেও দলীয় সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। সর্বত্র লুটপাট ও দলীয়করণ চলছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকার পরিচালনায় ছয় মাস যথাযথ সময় না হলেও তাদের ব্যর্থতা এবং অপরিকল্পনার জন্য জনগণের কাছে তারা দুঃখ প্রকাশ করেনি। সরকার তাদের পুরনো রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে। যদি সরকার সেখান থেকে ফিরে না আসে তাহলে তাদেরকে ব্যাপক গণ আন্দোলনের মুখে পড়তে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারেক রহমানের আসলে কোনো পরিকল্পনা নেই।’ সরকারের কার্যক্রমকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া’ বলেও মন্তব্য করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত জাতীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার অভিযোগও তোলেন নাহিদ। তাঁর দাবি, বর্তমানে কোনো সংকট তৈরি হলে সরকার কখনো ফ্যাসিস্ট, আবার কখনো অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে। অথচ এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি শুরু থেকেই বলে আসছে, সরকার গণভোটের গণরায় প্রত্যাখ্যান করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
তিনি জানান, বিরোধী দল তাদের অবস্থান থেকে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় লং মার্চ থেকে সরকারকে কঠোর বার্তা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সালেহ উদ্দিন সিফাত, যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলামসহ দলটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।