বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সরকারের নীতি প্রণয়ন ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে নির্ভরযোগ্য তথ্যের বিকল্প নেই। তথ্য নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি করলে সরকার আসলে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করে। তাই পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, পরিমাপযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কার্যালয়ে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান, টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো তথ্য বা ডেটা। নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কোনো সরকারের পক্ষে সঠিক নীতি তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। একইভাবে তথ্য ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা গবেষকের পক্ষেও সামনে এগোনো কঠিন।
তিনি বলেন, “আমি একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, বিবিএসকে আমড়া পূর্ণ স্বাধীনতা দেব। তাদের এই কাজে পৌঁছানোর জন্য যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে আমড়া এগিয়ে যাচ্ছি।”
তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, কোনো তথ্য পরিমাপযোগ্য না হলে এবং তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেই তথ্যের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হয় না। পরিসংখ্যানের ওপর আস্থা না থাকলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়াও সম্ভব নয়।
তাঁর ভাষ্য, কোনো সরকার তথ্য নিয়ে কারসাজি করলে তা নিজের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। কারণ, সরকারের কোনো কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রথমেই সঠিক তথ্য প্রয়োজন। তথ্যের ভিত্তি দুর্বল হলে নিজের পরিকল্পনা ও কর্মসূচির বাস্তব অবস্থাও সঠিকভাবে বোঝা যাবে না।
পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর করতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিবিএসকে কীভাবে আরও ক্ষমতায়ন করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেওয়া হচ্ছে। অতীতের ভুল ও অসংগতিগুলো চিহ্নিত না করে সেগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। এ কারণে পরিসংখ্যান ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্য অতীতের কোনো সরকারকে দোষারোপ করা নয়, বরং সমস্যার কারণ খুঁজে সমাধানের পথ বের করা।
শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অতীতে দেশে অনেক নীতিমালা তৈরি হলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এবার ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে তথ্যের সমন্বয় ও ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ওয়ালেট, ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য জরুরি। তথ্যের যথাযথ ব্যবহার ছাড়া সরকারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব নয়।
পরিসংখ্যানের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন আমির খসরু। তিনি বলেন, পরিসংখ্যান শুধু সরকারের নিজস্ব সম্পদ নয়, এর মালিক জনগণও। তাই গবেষণা ও জনস্বার্থে এসব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিবিএসে গবেষণার জন্য যে সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে, সেখানকার তথ্য অনলাইনে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তাঁর মতে, তথ্য যত বেশি উন্মুক্ত হবে, তত বেশি মতামত ও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে। এতে সরকারের কোথায় ভুল হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে। জনগণের কাছে সরকারের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মানসম্পন্ন ও বিজ্ঞানসম্মত পরিসংখ্যান, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ জননীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে পরিসংখ্যানের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, কোনো অবস্থাতেই তথ্যের বিকৃতি হতে দেওয়া হবে না। জনগণের জন্য নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ ও সহজলভ্য তথ্য নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই কার্যকর পরিকল্পনা, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানো এবং সুষম ও টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের সঠিক পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন জরুরি। এজন্য মানসম্মত, নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী পরিসংখ্যানের কোনো বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।
মো. ফিরোজ সরকার আরও বলেন, বিবিএসকে আধুনিক, দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি থেকে শুরু করে নীতির বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পরিসংখ্যানের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এটি। তাই তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি।
অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিবিএসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।