লটারির মাধ্যমে প্রশাসনে বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চাচ্ছে সরকার। কারণ এদেশে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সরকার লটারি পদ্ধতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রথম এ পদ্ধতি চালু করে। পরবর্তীতে আইন মন্ত্রণালয়ও এ পথ অনুসরণ করে। এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় লটারি পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে। প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রশাসনে প্রচলিত বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হত। কিন্তু ওই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে প্রশ্ন ও অসন্তোষ। এ অবস্থায় বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যদের তালিকা থেকে প্রকাশ্যে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, তদবির ও বদলি বাণিজ্যের সুযোগ কমবে বলে মনে করছে সরকার। পাশাপাশি বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের উপযুক্ত স্থানে পদায়নের সুযোগ তৈরি হবে। যদিও এ পদ্ধতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে কারা লটারিতে অংশ নিতে পারবেন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজন, জনবল সংকট ও বিশেষ পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়ার ওপর।
সূত্র জানায়, প্রশাসনে দুর্নীতির অন্যতম বড় উৎস বদলি ও পদায়ন। সেখানে তদবির ও অনিয়মের প্রবণতাও বেশি। প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বিদ্যমান পরিস্থিতি উত্তরণে লটারি পদ্ধতি একটি কার্যকর ব্যবস্থা বলে মনে করছেন। কারণ লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম। তবে অবশ্যই লটারি প্রক্রিয়াকে অবশ্যই কারসাজি ও অনিয়মমুক্ত থাকা জরুরি। প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হলে যার যেখানে পদায়ন হবে, সেখানে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তির সুযোগ কম। চলতি বছরের ৩০ জুলাই গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রথম দফায় ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করে। আর ৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় একই পদ্ধতিতে আরও ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। তারপর ১৬ আগস্ট তৃতীয় দফায় ৪০৯ জন সহকারী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর বদলি হয়। আর সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর লটারির মাধ্যমে আরও ১৫৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়ন হয়। সব মিলিয়ে চার দফায় ১ হাজার ৫৮৫ জন প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও গত ৬ অক্টোবর ঢাকা জেলার গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় পদায়নের জন্য লটারির আয়োজন করে। তাতে দেশের ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৩১ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্য থেকে ১৮ জনকে বাছাই করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত এবং প্রায় ১৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়নের জন্য লটারির মাধ্যমে এ ১৮ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে। লটারি পদ্ধতি চালুর কারণ ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রীও বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি-পদায়ন নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার পোস্টিংকে প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেসব স্টেশনের সিন্ডিকেট ভাঙতেই লটারি পদ্ধতির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার মাধ্যমে কোনো বৈষম্য ছাড়াই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। পর্যায়ক্রমে সব জায়গার পদায়নেও স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে লটারির মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দক্ষতা ও কর্মস্থলের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত পদায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলিতেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় লটারি পদ্ধতি চালুর কথা ভাবছে। ইতিমধ্যে শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের দেয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একই স্থানে একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রয়োজনে লটারি করা হবে। বদলিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে না। তবেবে এ পদ্ধতি কার্যকর করতে হলে বিদ্যমান বদলি নীতিমালায় সংশোধন আনতে হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা প্রকাশের পর জুনে নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়। তারপর জুলাইয়ে নীতিমালায় সংশোধন আনা হয়েছিল।
অন্যদিকে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন নিয়ে অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তদবির ও প্রভাবমুক্ত স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লটারির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়ন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পরিবেশে লটারির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে বদলির জন্য তদবির এলেও এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে সুযোগ বন্ধ করে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, প্রশাসনে বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ওই লক্ষ্যেই কাজ চলছে। এরই মধ্যে এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ফলে কমে আসবে বদলি-পদায়নে তদবির ও অনিয়মের সুযোগ।