জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে নিম্নমানের ঔষধ বাজারে বহাল তবিয়তে রাখার অভিযোগ উঠেছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এবং লাইসেন্সিং অথরিটি মোহা. আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে মেসার্স বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে যোগসাজশ, ঘুষ-দুর্নীতি এবং মান-বহির্ভূত ঔষধর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। জাতীয় ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার (ঘউঈখ), মহাখালী, ঢাকা কর্তৃক বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত বহুল ব্যবহৃত দুটি ঔষধÑগধীপড়ৎধষ-উঢ ঞধনষবঃ এবং গধীপড়ৎধষ-উ ঞধনষবঃ-এর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গত ৬ এপ্রিল প্রকাশিত পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে উভয় ঔষধর নির্দিষ্ট ব্যাচকে নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মান-বহির্ভূত হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গধীপড়ৎধষ-উঢ ঞধনষবঃ-এর (ব্যাচ নং- ৫ক১৭২৭৪) ঘোষিত ভিটামিন-ডি৩ প্রতি ট্যাবলেটে ৪০০ ওট থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় পাওয়া গেছে মাত্র ২৭৩.৮১ ওট, যা প্রায় সাড়ে একত্রিশ শতাংশ কম। একইভাবে গধীপড়ৎধষ-উ ঞধনষবঃ-এর (ব্যাচ নং- ৫ক১২২৭৬) ঘোষিত ভিটামিন-ডি৩ ২০০ ওট-এর বিপরীতে পাওয়া যায় ১৩৫.৫২ ওট, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে বত্রিশ শতাংশ ঘাটতি। ড্রাগ অ্যানালিস্ট তার প্রতিবেদনে সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পরীক্ষিত নমুনাগুলো নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নয় এবং সম্পূর্ণ মান-বহির্ভূত।
এই ভয়াবহ মানহীনতা প্রমাণিত হওয়ার পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওই ঔষধ দুটির নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং অবিলম্বে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মান-বহির্ভূত ঔষধর বিষয়ে ঔষধ আদালতে মামলা দায়েরের উদ্যোগ নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে এরপর থেকেই। অভিযোগ উঠেছে, লাইসেন্সিং অথরিটি মোহাঃ আলমগীর হোসেনের দায়িত্বকালীন সময়ে এই আদেশের পরবর্তী বাস্তবায়ন রহস্যজনকভাবে থমকে যায়। ঔষধ আদালতে নিয়মিত মামলা দায়েরের কথা থাকলেও তা ফাইলবন্দী করে রাখা হয় কিংবা নামমাত্র পদক্ষেপে ঝুলিয়ে রাখা হয়। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নিবন্ধন স্থগিত থাকার পরেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি অবৈধ উপায়ে তাদের উৎপাদিত মানহীন ঔষধ বাজারে সরবরাহ ও বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি পরীক্ষাগারে প্রমাণিত মানহীন ও জীবনঘাতী উপাদানের ঘাটতিযুক্ত ঔষধ জব্দের পর এবং আদালতের মামলার নির্দেশ থাকার পরেও কোন অদৃশ্য শক্তির বলে দায়িত্বরত মহাপরিচালক এই প্রভাবশালী ঔষধ কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলেন না? এর নেপথ্যে মোহাঃ আলমগীর হোসেন ও বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, ঘুষ বা বড় ধরনের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন চারদিকে গুঞ্জন চলছে।
জনস্বাস্থ্য ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার এমন নগ্ন লঙ্ঘন রোধে এবং দুর্নীতির মূল উদঘাটন করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের আবেদন দাখিল করা হয়েছে। আবেদনে দাপ্তরিক নথি সংগ্রহ, মামলা না হওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংক হিসাব যাচাই এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা এই চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে জানতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।