তীব্র যানবাহন সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে মাঠপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যক্রম। পর্যাপ্ত বাহনের অভাবে পুলিশের নিয়মিত টহল, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি ও জরুরি ঘটনায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে টহল, ছিনতাই-ডাকাতিপ্রবণ এলাকায় অভিযান এবং সন্দেহভাজন অপরাধীদের ধাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যানবাহনের স্বল্পতা। বর্তমানে দেশের পুলিশ বাহিনীতে যে পরিমাণ যানবাহন রয়েছে, তা দিয়ে একাধিক এলাকায় একই সময়ে পুলিশি সহায়তার প্রয়োজন হলে সীমিত গাড়ি দিয়ে আশানুরূপ সাড়া দেয়া সম্ভব নয়। বরং এখন অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্প ব্যবস্থায় কিংবা হেঁটে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। পুলিশ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের পুলিশ বাহিনীতে বর্তমানে যেসব যানবাহন রয়েছে, তার অধিকাংশই পুরনো ও লক্করঝক্কর। ওসব পুরনো যানবাহন নিয়ে অভিযান ও টহলের সময় অনেক ক্ষেত্রেই অচল হয়ে পড়ে। তাতে পুলিশের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অপচয় হয় সময় ও জনবল। এমন পরিস্থিতি পুলিশের দ্রুত সাড়া দেয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে নাগরিকরা প্রত্যাশিত সেবা বঞ্চিত হয়। বর্তমানে পুলিশের অকেজো যানবাহনের তালিকা ক্রমাগত দীর্ঘই হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী বিগত ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পুলিশ বাহিনীর ৩ হাজার ৬৪২টি যানবাহন অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ প্রতিরোধ ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুলিশের নিয়মিত টহল। অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহলের মাধ্যমে অপরাধীদের তৎপরতা নজরদারির পাশাপাশি জরুরি ঘটনায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু বর্তমানে তীব্র যানবাহন সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মূলত পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় পুলিশ সদস্যদের পক্ষে নিয়মিত টহল, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়া কঠিন হচ্ছে। আর অপরাধীরা এ সুযোগ নিচ্ছে। পুলিশের অনুমোদিত স্থায়ী সরঞ্জাম তালিকায় মোট ১৬ হাজার ২০০টি যানবাহন রয়েছে। তার মধ্যে ৯ হাজার ৭৮৭টি মোটরসাইকেল। কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ৫০৩টি সচল রয়েছে। বাকি ৪ হাজার ২৮৪টি মোটরসাইকেলই অচল। তাছাড়া ৮ বছরের বেশি পুলিশের ৬ হাজার ৫৫৮টি যানবাহনের বয়স। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে ওসব যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে। তাছাড়া মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও কমছে। বর্তমানে দেশের থানা ও ফঁাড়িতে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় নিয়মিত টহল, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, পুলিশ বাহিনীতে বিগত ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৬৪২টি যানবাহন অকেজো ঘোষণা করা হলেও ওই সময়ে মাত্র ২ হাজার ২৪৯টি নতুন যানবাহন কেনা হয়েছে। ফলে অকেজো যানবাহন প্রতিস্থাপনে রয়ে গেছে বড় ঘাটতি। আর থানাভিত্তিক যানবাহনের চাহিদা পূরণেও বড় সংকট রয়েছে। প্রতিটি থানায় দুটি করে ডাবল কেবিন ও দুটি করে সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ডাবল কেবিন পিকআপের ঘাটতি ১ হাজার ৩২৮টি এবং সিঙ্গেল কেবিন পিকআপের ২ হাজার ৬৫৬টি। সব মিলিয়ে ওই দুই ধরনের পিকআপে মোট ঘাটতি ৩ হাজার ৯৮৪টি। ওই সংকট কাটিয়ে পুলিশের কার্যক্রম গতিশীল রাখতে প্রতি বছর শুধু যানবাহন খাতেই প্রয়োজন ৩০০-৩৫০ কোটি টাকা। ওই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান, পুরনো যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং নতুন যানবাহন সংগ্রহের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা জরুরি। তা না হলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্ষমতা বাড়ানো যাবে না।
এদিকে পুলিশের বিদ্যমান যানবাহন সঙ্কট প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকলে নিয়মিত টহল পরিচালনা, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া কঠিন। এর সুযোগ নিতে পারে অপরাধীরা। একই সাথে মানুষের মাঝে বাড়তে পারে নিরাপত্তাহীনতা। পুলিশের কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করতে হলে শুধু জনবল বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধাও নিশ্চিত করা জরুরি। সেক্ষেত্রে চাহিদার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ, পুরনো যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে পুলিশ হেডকোয়াটার্সের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) কামারুম মুনিরা জানান, পুলিশের কার্যক্রম গতিশীল রাখা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যানবাহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুরনো ও অকেজো যানবাহনের পরিবর্তে নতুন যানবাহন সংযোজনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যানবাহন নিশ্চিত করা গেলে টহল কার্যক্রম জোরদার, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়া আরো সহজ হবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।