৩৬ দিন পর ক্লাসে ফিরছেন চুয়েট শিক্ষার্থীরা, আন্দোলন চলবে

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
৩৬ দিন পর ক্লাসে ফিরছেন চুয়েট শিক্ষার্থীরা, আন্দোলন চলবে
ছবি: সংগ্রহীত

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা ৩৬ দিন শাটডাউন কর্মসূচি পালনের পর ক্লাসে ফিরছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা। বুধবার (২৮ অক্টোবর) থেকে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। তবে আন্দোলনের কারণে স্থগিত হওয়া ২৪টি পরীক্ষার নতুন সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সাবেক উপাচার্যকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত জানান আন্দোলনকারীরা। বিভাগীয় প্রধান, ডিন ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক শিক্ষার্থী। তবে নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের প্রতি অসহযোগ অব্যাহত থাকবে বলে স্পষ্ট করেছেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত না করার স্বার্থে একাডেমিক কার্যক্রমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে এসে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করলে পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি কঠোরভাবে পালন করা হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।

দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে চুয়েটে ২১ কর্মদিবস ক্লাস বন্ধ ছিল। এ সময়ে বিভিন্ন বিভাগের পূর্বনির্ধারিত ২৪টি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এসব পরীক্ষার নতুন সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিভাগীয় প্রধান ও ডিনরা পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে চিঠি দিলে রুটিন তৈরি করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। স্থগিত পরীক্ষাগুলো চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ক্লাস শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে এক আন্দোলনকারী বলেন, বিভাগীয় প্রধান, ডিন ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেই বুধবার থেকে ক্লাস শুরুর বিষয়টি ঠিক করা হয়েছে। পরীক্ষার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধান ও ডিনরা সিদ্ধান্ত নেবেন। ইউজিসির পরামর্শক কমিটির সঙ্গেও তাঁরা আলোচনায় বসবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গঠিত ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি বুধবার সকালে চুয়েট পরিদর্শন করবে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।

গত ১৮ অক্টোবর চুয়েটের সংকট নিরসনে এ কমিটি গঠন করে ইউজিসি। কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা প্রতিনিধি রাখা হয়নি।

এর আগে ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে অনলাইনে চুয়েটের সিন্ডিকেট সভা করেন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। ১৫ সদস্যের সিন্ডিকেটে ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন ছয়জন। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসন এবং দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

চুয়েটের উপাচার্য পদে পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে এ সংকটের সূত্রপাত। দায়িত্ব নেওয়ার ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এর পরদিন, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি ঘোষণা করে চুয়েট শিক্ষক সমিতি এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংগঠনগুলো। আন্দোলন চলার মধ্যেই ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইনে উপাচার্য পদে যোগ দেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম।

১২ অক্টোবর সকালে প্রথমবারের মতো নিজের কার্যালয়ে যান নতুন উপাচার্য। ওই দিন দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনে তালা দিলে তিনি সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের সহায়তায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন তিনি।

পরে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটি থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ছুটি শেষে রোববার থেকে কর্মদিবস শুরু হলেও আন্দোলনের কারণে মঙ্গলবার পর্যন্ত চুয়েটের একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল।

রোববার আন্দোলনের ৩৪তম দিনে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই দিন সাধারণ সভা করে শিক্ষক সমিতিও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত না করার স্বার্থে একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন যৌথ সভা শেষে এক বিবৃতিতে একই অবস্থান জানায়।

তবে নতুন উপাচার্যের প্রতি অসহযোগের অবস্থান থেকে সরে আসেনি সংগঠনগুলো। শিক্ষক সমিতি জানিয়েছে, শেখ শরীফুল আলমের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক যেকোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ চলবে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও বলেছেন, নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে দায়িত্ব পালনের উদ্যোগ নিলে তাঁরা আবার শাটডাউন কর্মসূচি এবং ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনে ফিরে যাবেন। অর্থাৎ একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলেও উপাচার্যকে ঘিরে বিরোধের সমাধান এখনো হয়নি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে