বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে ধীরগতি। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি এবং নতুন করে দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা অর্থনীতির সামনে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সামপ্রতিক মূল্যায়নেও অর্থনীতির এই চাপের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে গতি কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্যের ঝুঁকি বাড়লেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দুটি বিষয়-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো। কারণ ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন শিল্প ও ব্যবসা গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়বে। কিন্তু বিনিয়োগে গতি আনতে শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, অন্যদিকে চলমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কিছু সিদ্ধান্তও নিতে হবে। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক কমে যাওয়ার বিষয়টি কেবল একটি নেতিবাচক ঘটনা নয়, বরং এর ভেতরে একটা ইতিবাচক সংস্কারের ইঙ্গিত রয়েছে। অতীতে যখন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি বেশি ছিল, তখন মোটা অঙ্কের টাকা ব্যাংকিং খাত থেকে তুলে বিদেশে পাচার করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই অপচয়মূলক ঋণ ও পাচারের পথগুলো কঠিন হওয়ায় ঋণের গতি কমেছে, যা অর্থনীতির জন্য এক ধরনের ক্ষতিকর প্রবণতা বন্ধের সিগন্যাল দিচ্ছে। অবশ্য যদি প্রকৃত উদ্যোক্তারাও ঋণ না পেয়ে থাকেন, তবে তা চিন্তার বিষয়। ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক কোম্পানি আইনে কঠোর পরিবর্তন প্রয়োজন। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে একক পরিবারের কর্তৃত্ব কমানো, পরিচালকের সংখ্যা পরিবারপ্রতি একজনে নামিয়ে আনা এবং মেয়াদের সময়সীমা ৬ বছরে সীমিত রাখা জরুরি। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদারে রিস্ক-বেসড সুপারভিশন ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হবে, যাতে ভালো ব্যাংকে অহেতুক সময় নষ্ট না করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে নিবিড় নজরদারি চালানো যায়। তবে আইনি ও টেকনিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক যতই শক্তিশালী করা হোক না কেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপ থেকে ব্যাংকিং খাত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুক্ত রাখা না গেলে কোনো সংস্কারই বাস্তবে রূপ নেবে না। বিদ্যমান স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে হলে সরকারকে শুধু আশ্বাস বা আশাবাদের কথা না বলে বাস্তবে বলিষ্ঠ ও সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিল্প খাতের চাকা পুরোপুরি সচল রাখতে এবং উৎপাদন খরচ কমানোর স্বার্থে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ঋণের উচ্চ সুদহারের চাপ কমিয়ে আনাসহ ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ উদ্যোক্তাদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনাও অপরিহার্য।