এ আজ বৃহস্পতিবার দাকোপের নলিয়ানে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে দাকোপবাসীর মাঝে ব্যাপক আবেগ-উচ্ছাস। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বঞ্চনার অবসান আর উন্নয়নে ন্যায় সঙ্গত অধিকার চাই দাকোপবাসী। স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথম কোন প্রধানমন্ত্রী দাকোপের সুন্দরবন লাগোয়া নলিয়ান এলাকায় আসছেন। তার এই সফর স্থানীয়দের কাছে স্বপ্নের মত। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে এলাকাবাসীর মাঝে ব্যাপক আবেগ উচ্ছাস লক্ষ্য করা গেছে। তবে সেখানে কোন জনসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বা সরকারী কর্মসূচী না থাকায় অনেকের মাঝে আছে হতাশা। এত কাছে থাকা সত্বেও প্রধানমন্ত্রীর মূখ থেকে কথা শোনা এবং কাছ থেকে একনজর দেখার সুযোগ পাবেনা এমনটা ভেবে তারা হতাশ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সুত্রের তথ্যমতে হেলিকপ্টার যোগে সকাল সাড়ে ১০ টায় নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরন করে নৌপথে মোংলায় যাবেন তিনি। কালাবগী গ্রামের রহিমা বিবি বলেন, “দেশের রাজা আসতেচ শুনে খুব ভাল লাগদেচ, আঙ্গা ভাঙন বন্দ কুরি দেখ আর গরীব মানষির জন্য রাজা যদি পানির ট্যাংকি দেয় আমরা খুব খুশী”। কাকড়া বুনিয়া গ্রামের এ্যাডঃ জি এম মাসুদ করিম বলেন, অবহেলিত এই অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রীর আগমনে আমরা ধন্য। তিনি আমাদের ভাঙন প্রতিরোধ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যবস্থা নিলে দাকোপবাসী খুব খুশী হবে। চারিপাশে নদী বেষ্টিত এই উপজেলার আয়তন ৯৯১.৯৮ বর্গ কিলোমিটার (সুন্দরবনসহ)। দেশের যে কোন অঞ্চলের সাথে তুলনা করলে উপেক্ষা আর বঞ্চনার উদহারন হতে পারে এই দাকোপ উপজেলা। উপকুলিয় এই উপজেলার ২ লক্ষ মানুষের জীবনে নদী একটি অভিশাপের নাম। প্রতি বছর বিপুল পরিমান জমি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ী আর চাষযোগ্য জমি। বদলে যাচ্ছে জনবসতির মানচিত্র। বাস্তুচ্যুত হয়ে হাজার হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে এলাকা ছাড়া। অব্যহত নদী ভাঙনের প্রভাবে উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যান্ত নাজুক। বরনপাড়া-পানখালী নদীর উপর ব্রীজ হবে এমন স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লান্ত দাকোপবাসী। এটি এখন হয়ে উঠেছে সংসদ নির্বাচনে ভোট নেওয়ার লোভনীয় ইস্যু। এই ব্রীজটি না হওয়ায় খুলনা জেলা সদর থেকে দাকোপের সড়ক যোগাযোগ এক প্রকার বিচ্ছিন্ন। যার প্রভাব পড়ে ব্যবসা বাণিজ্য ও জনজীবনে। পানখালী ব্রীজ, পোদ্দারগঞ্জ বীজ, খুলনার গল্লামারী হতে নলিয়ান পর্যন্ত উন্নত সড়ক নির্মান প্রকল্পের প্রস্তাব ও আশ্বাস যেন ধারাবাহিক চলমান প্রক্রিয়া। এ অঞ্চলের মানুষ এই আশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। অভ্যান্তরীন সড়ক যোগাযোগে অধিকাংশ রাস্তা চলাচল অযোগ্য। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে উপজেলা বাসীর চলাচলে সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতে হয়। এখানে গভীর অগভীর নলকুপের পানি পান যোগ্য না হওয়ায় উপজেলা বাসীর সুপেয় পানি বলতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা। কিন্তু জনগোষ্টির বড় অংশ সরকারের দেওয়া পানির ট্যাংকি সহায়তা না পাওয়ায় বর্ষার মৌসুম শেষ হলে পানির জন্য হাহাকার পড়ে যায়। স্বচ্ছল পরিবার গুলো দূরবর্তী অঞ্চল থেকে পানি কিনে এনে খায়, কিন্তু মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তরা খাওয়ার অযোগ্য পানি খেয়ে জীবন ধারন করতে বাধ্য হয়। স্বাস্থ্যসেবা বলতে এখানে উপজেলা সদরে থাকা একমাত্র ৫০ শষ্যার হাসপাতাল। যেখানে নেই কোন গাইনী ও সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। হাসপাতালের ল্যাব পরীক্ষাগারে নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। জনবল সংকটে খুড়িয়ে চলা হাসপাতালটি বলা যায় নিজেই একটা রোগী। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে সুতারখালী এলাকা থেকে গর্ভবতী মায়েদের এই হাসপাতালে আনার পথে মৃত্যু ঘটার বেশ কিছু উদহারন আছে। বৃহৎ ইউনিয়ন সুতারখালীতে কমপক্ষে ২০ শষ্যার হাসপাতাল এবং সকল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোকে সেবা দেওয়ার সক্ষম করে গড়ে তোলার দাবী এলাকাবাসীর। এ অঞ্চলে বাগদা চিংড়ী চাষ বন্দ হওয়ার পর দাকোপ বাসীর আয়ের উৎস্য বলতে নদীতে চিংড়ী পোনা আহরন আর সুন্দরবন কেন্দ্রীক নানা পেশা। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় সেই পেশা বন্দের দ্বারপ্রান্তে। চিংড়ী পোনা আহরনে নেটজাল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আর সুন্দরবনে গোলপাতা ও কাঠ আহরন প্রায় বন্দের পথে। একই সাথে বনদস্যুদের বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে বনজীবিরা পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ জীবিকার তাগিদে চলে গেছে বিভিন্ন শহরে। অথচ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর নিরাপদ কর্ম পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে দাকোপ হতে পারে সম্ভবনার এক বিশেষ উদহারন। বিগত দেড় দশক ধরে পর্যায়ক্রমে দাকোপের মানুষ কৃষি উৎপাদনের দিকে ঝুকে পড়েছে। সম্ভবনার এই খাতকে এগিয়ে নিতে দরকার পর্যাপ্ত খাল খননের মাধ্যমে সেচ পানির নিশ্চয়তা, আর মালামাল পরিবহনে উন্নত সড়ক ও বাজার ব্যবস্থাপনা। এখানে সুন্দরবন কেন্দ্রীক পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভবনা আছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী বন্দর মোংলাকে ঘিরে দাকোপে সুযোগ আছে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার। কারন বন্দর এলাকায় পর্যাপ্ত ভূমি না থাকায় নদী তীরবর্তী দাকোপে ঘটতে পারে শিল্পের বিকাশ। যার মাধ্যমে সৃষ্টি হবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে আসবে বিশেষ গতি। মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রাখবে বিশেষ ভূমিকা। এর জন্য দরকার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর নিরাপদ কর্মপরিবেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে নলিয়ানের মত পল্লীতে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে বঞ্চিত এই জনপদের মানুষ দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান চায়। উন্নয়ন বঞ্চিত দাকোপবাসী এবার তাদের ন্যায় সঙ্গত অধিকার চায়।