শীতের ছোঁয়া চারদিকে জানান দিতেই কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পুরোদমে চলছে খেজুরের রস সংগ্রহের কর্মযজ্ঞ। ভোরের কুয়াশা আর সন্ধ্যার ঠান্ডা হাওয়ায় মাঠে-ঘাটে দেখা মিলছে গাছিদের পুরনো সেই চিরচেনা ব্যস্ততা। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর দুরান্ত থেকে আসা গাছিরা নেমে পড়েছেন গাছ পরিষ্কার, কাটা ও রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে। এ বিষয়টি গ্রামবাংলার শীতের আগমনী বার্তাকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।কালীগঞ্জসহ ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন গ্রামে দেখা যায়, খেজুর গাছের মাথায় উঠে দা, ছেনি নিয়ে রসের হাঁড়ি বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন গাছিরা। গাছের বুক চিরে রস নামানোর যে সূক্ষ্ম কাজটি করতে হয়, তা দক্ষ হাতে করে যাচ্ছেন তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, আশ্বিন-কার্তিকের শেষ দিক থেকেই এই প্রস্তুতি শুরু হয়। পৌষ-মাঘ পেরিয়ে ফাগুন মাস পর্যন্ত চলে রস সংগ্রহের মৌসুম।মুশফিকুর রহমান বলেন‘শীতের আগমন মানেই টাটকা খেজুর রসের ঘ্রান। ভোরবেলা হাঁড়ি হাতে গাছিদের পাতিল নামাতে দেখার দৃশ্যটা যেন গ্রামের চিরচেনা আনন্দ। খেজুরের রস ও গুড় শুধু শীতের খাবার নয়, এটি ঝিনাইদহ জেলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্মৃতির অংশ। ভাপা পিঠার সঙ্গে টাটকা রস খাওয়ার জন্য ভোরে অনেকেই গাছিদের বাড়ি বা রসের হাঁড়ির পাশে ভিড় করেন।
কুষ্টিয়া থেকে আসা গাছি রেজাউল ইসলাম বলেন, সময়মতো গাছ পরিষ্কার ও কাটা না হলে রস জমে না। রসের পরিমাণ ও মান অনেকটাই নির্ভর করে গাছের পরিচর্যা ও দক্ষতার ওপর। তিনি আরও বলেন, এই কাজে ঝুঁকি অনেক। মাঝেমধ্যে অনেকে গাছ থেকে পড়ে আঘাত পান। তারপরও বছরের এই সময়টায় আমরা জীবিকার তাগিদে দিনরাত খেটে যাই। একটি গাছ থেকে পুরো সিজনে দৈনিক গড়ে ৮-১০ কেজি রস পাওয়া যায়।
এলাকাবাসী বলেন, খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এই ঐতিহ্যকে যেকোন মূল্যে আমাদের রক্ষা করতে হবে। আর প্রতিটি ঋতুর রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। আর শীতকালের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঐতিহ্য খেজুর গাছের রস। শীতের সকালে খেজুর গাছের সুমিষ্ট রসের সঙ্গে হাতে ভাজা মুড়ি কিংবা চাল ভাজা খাওয়ার মজাই আলাদা। আর মাত্র কয়েক দিন পর রস সংগ্রহ করে রস থেকে গুড় তৈরির পর্ব শুরু হয়ে চলবে প্রায় ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি ঝিনাইদহ জেলার প্রতিটি গ্রাম এলাকায় চোখে পড়ছে।কিন্তু বর্তমান সময়ে আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে খেজুর গাছ। যার কারণে রসের উৎপাদনও কমেছে অনেক।কোন পরিচর্যা ছাড়াই অনেকটা প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠতো এসব খেজুর গাছ। প্রতিটি পরিবারের চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত রস দিয়ে তৈরি করা হতো সুস্বাদু খেজুরের গুড়। গ্রামীন জনপদে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে পুকুরের পাড়ে রাস্তার ধারে পরিবেশ বান্ধব খেজুর গাছ এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। ইট ভাটার রাহু গ্রামে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার বেশি হওয়ার কারণে যে পরিমাণ গাছ চোখে পড়ে তা নির্বিচারে নিধন করায় দিনদিন খেজুর গাছ কমছেই।
খেজুর গাছ কাটার কাজটি শিল্প আর দক্ষতায় ভরা। ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে রয়েছে কৌশল, রয়েছে ধৈর্য ও অপেক্ষার পালা। এ জন্য মৌসুমে আসার সাথে সাথে দক্ষ গাছিদের কদর বাড়ে। পরিত্যক্ত জায়গা গুলোতে খেজুর গাছ নতুন করে রোপণ করে একটু যত্ন নিই তাহলে আমাদের মতো আগামী প্রজন্মরা শীতের আকর্ষণ সুমিষ্ট এই খেজুর রস খেতে পারবে। তাই আমাদের সবারই উচিত বাণিজ্যিক ভাবে না হলেও অন্যান্য গাছের মতো দু-একটি খেজুর গাছ রোপণ করা।