গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ থাকবে বলে কর্তৃপক্ষের দেওয়া নোটিশে জানানো হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে শুরু হওয়া আগুন দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে সম্পূর্ণ নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের ডাম্পিং কার্যক্রমও শেষ হয়েছে। আগুনে কারখানার যন্ত্রপাতি ও মালামালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া রাসায়নিকের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে এক শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কারখানার ফ্যাক্টরি ইনচার্জ মোহাম্মদ আবু সাঈদের স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ কারখানার প্রধান ফটকে টাঙানো হয়। এতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে উৎপাদন কার্যক্রম কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে নোটিশে কিছু জানানো হয়নি।
বুধবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে কারখানাটিতে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। প্রথমে টঙ্গী ফায়ার স্টেশনের তিনটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পরে বিভিন্ন ফায়ার স্টেশন থেকে আরও ১৮টি ইউনিট যোগ দেয়। মোট ২১টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় বেলা ১টা ৫৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন পুরোপুরি নেভাতে রাত পর্যন্ত কাজ চালাতে হয়। রাত ১০টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়। পরে ডাম্পিং কার্যক্রম শেষ করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
টঙ্গী ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহিন আলম জানান, বুধবার রাত ১১টার দিকে ডাম্পিংয়ের কাজ শেষ হয়। আগুনের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে তিনি বলেন, কারখানার তিনতলা ভবনের ছাদে থাকা একটি শেড থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন পাশের পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানান, আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
কারখানায় আগুনের তীব্রতা বাড়ার পেছনে রাসায়নিক পদার্থ ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম পেপারের নিচে থাকা রাবারের ভূমিকা ছিল বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, কারখানার জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি কারখানায় দাহ্য পদার্থ না থাকার কথাও বলেছিলেন।
কারখানাটিতে প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করেন বলে জানিয়েছিলেন শহিদুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনের চতুর্থ তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে শ্রমিকেরা চিৎকার শুরু করেন। পরে জরুরি অ্যালার্ম বাজানো হলে সবাই দ্রুত কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন।
অগ্নিকাণ্ডে কারখানার উৎপাদন যন্ত্রপাতি, মজুত মালামাল ও ওষুধ তৈরির উপকরণের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কারখানার দুটি ভবনের দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
আগুন নেভানোর সময় ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মকর্তা নূর উদ্দিন ও জহিরুল ইসলাম এবং ফায়ার ফাইটার কালাম আহত হন। তাঁদের মধ্যে নূর উদ্দিন ও জহিরুল ইসলামকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কালামকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাসায়নিকের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে এক শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে কারখানার নিরাপত্তাকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেলেও শ্রমিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। কারখানার ফটকে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের কেউ কথা বলেননি।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।